ক্ষণিকের অতিথি — ২

এটা প্রদীপ্তর সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্ব -এর লিঙ্ক।

আমিঃ তুমি সিনেমার লাইনে কী করে আসলে?

প্রদীপ্তঃ সিনেমা তো দেখতাম ছোটবেলা থেকেই। বাংলা সিনেমা তখন মোটেই ভাল লাগতনা। সাদা কালো ছবি, মধ্যবিত্ত বাড়ি, ছেঁড়া পাঞ্জাবি, ময়লা ব্যাগ নিয়ে বাজার করতে যাচ্ছে। নয়ত গ্রামের দুঃস্থ পরিবারের দুঃখ কষ্টের গল্প। অন্যদিকে হিন্দি সিনেমা দারুণ রংচঙে। বড় বড় বাড়ি, গাড়ি, দারুণ স্টাইল। কত নাচ, গান। হিরো একেবারে রেঁলা নিয়ে থাকে। তখন সিনেমা বানানোর ইচ্ছে হত, আর মনে হত যদি বানাই তো এইরকমই বানাবো। রাজ কাপূর ছিলেন আমার আদর্শ।

Kashish-Mumbai International Queer Film Festival। Programming Director সাগর গুপ্তর সঙ্গে।

Kashish-Mumbai International Queer Film Festival। Programming Director সাগর গুপ্তর সঙ্গে।

ছবি আঁকার সূত্রে স্কুল শেষ করে ঢুকি কলকাতার আর্ট কলেজে। আমার আঁকার মাস্টারমশাই প্রায় জোর করেই ভর্তি করেছিলেন। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে তো বেরোলাম, এরপর কী? আমার বাবার মতে এতদিনে আমি সবে রঙের মিস্ত্রী হয়েছি, শিল্পী হতে এখনো বহু দেরী। তার কারণও আছে — আর্ট কলেজে ছবি আঁকার টেকনিকটাই মূলত শেখানো হয়, থিওরির ওপর জোর খুব একটা নেই। অথচ থিওরি নিয়ে পড়াশুনো না করে আর্টিস্ট হবার স্বপ্ন দেখা যায়না, অন্তত জিনিয়াস না হলে নয়। স্থির হল যে NIDতে যাব — বাবা, মা দুজনেরই ইচ্ছে। কিন্তু NIDতে কী নিয়ে পড়ব? ছবি আঁকার সঙ্গে তো সিনেমা বানানোর স্বপ্নটাও ছিল। ওটার কী হবে? ঠিক করলাম অ্যানিমেশন নিয়ে পড়াশুনো করব। ছবি আঁকা, সিনেমা করা, দুটোরই বুড়ি ছুঁয়ে রাখলাম।

Continue reading

Advertisements

রামধনু — ৩

ভেবেছিলাম এই প্রবন্ধ দুটো পোস্টেই শেষ করে দেব। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখছি কথা বেড়ে যাচ্ছে। এটা প্রবন্ধের তৃতীয় ভাগ। এর আগের ভাগটা এখানে পাবেন

এই পোস্টে আমরা ভিন্ন যৌনতার মানুষের প্রতি সমাজের মনোভাব নিয়ে আলোচনা করব। আগে আমরা বলেছি, ভারতে ঐতিহাসিক ভাবে ভিন্ন যৌনতাকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এখনো সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমকামীদের খোলা মনে মেনে নিতে পারবেন বলে মনে হয়না। কেন?

নিজেকে আমি প্রগতিশীল উদারমনস্ক ভাবতেই ভালবাসি। তবে এই উদারতা একদিনে আসেনি। এই মুহুর্তে ভিন্ন যৌনতার মানুষের প্রতি আমার যা দৃষ্টিভঙ্গি, দশ-পনেরো বছর আগে হয়ত সেটা ছিলনা। উদারতাটা এসেছে আস্তে আস্তে, অনেক সময় ধরে।

ছোটবেলায় যখন রাস্তাঘাটে প্রথম হিজড়েদের দেখি, মা-বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে ওরা কারা। উত্তর এসেছিল ভাসা ভাসা। সেই ভাসা ভাসা জ্ঞানটাই অনেক বড় বয়স অবধি একমাত্র সম্বল ছিল। কারণটা পরিষ্কার — হিজড়েদের আমরা স্থান দিয়েছি সমাজ জীবনের একেবারে প্রান্তে। তারা বড়জোর পথেঘাটে মাঝে মাঝে বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। কিন্তু তাদের মানুষ বলে গণ্য করা বা তাদের নিয়ে মাথা ঘামানোর দায় সমাজের নেই, আমারো ছিলনা।

Continue reading

রামধনু — ২

এই প্রবন্ধের প্রথম ভাগ পোস্ট করেছি আগে। এটা দ্বিতীয় ভাগ।

এই পোস্টে আমরা শীর্ষ আদালতের রায়ের বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। মাননীয় বিচারপতিদ্বয় জি এস সিঙ্গভি ও এস জে মুখোপাধ্যায় ১১ই ডিসেম্বর ২০১৩-র রায়ে জানিয়েছেন যে ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অসাংবিধানিক নয়। সংসদ চাইলে আইন পরিবর্তন করে এই ধারাটি রদ করতে পারে। হয়ত সেটা করার সময়ও উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ সেটা না করা হচ্ছে, ততক্ষণ এ ধারাটি বলবৎ থাকবে। এই রায়ের মাধ্যমে দিল্লী হাই কোর্টের ২০০৯ সালের রায়কে (যাতে ৩৭৭ ধারাকে ক্ষেত্রবিশেষে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল) নাকচ করা হল। এর বিরুদ্ধে একটি রিভিউ পিটিশন করা হয়, কিন্তু শীর্ষ আদালত সেটাও নাকচ করেন ২৮শে জানুয়ারি ২০১৪-তে।

এই রায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন ধরণের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বাদী পক্ষ এবং সমাজের রক্ষণশীল অংশ (যাঁদের মধ্যে কিছু নামজাদা রাজনীতিকও আছেন) এই রায়ে উৎফুল্ল। অন্যদিকে ভিন্ন যৌনতার মানুষ, এবং তাদের সঙ্গে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরা মর্মাহত। তাঁরা মনে করছেন যে এই রায় তাঁদের সুস্থ ভাবে নিজেদের মত করে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিল। এই দুদলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যাঁরা জড়িত নন, তাঁরা কী বলছেন?

Continue reading

রামধনু — ১

এই পোস্ট দুগ্ধপোষ্য শিশু ও নীতিবাগীশ জ্যাঠামশাইদের জন্য নয়। তাঁরা দয়া করে অন্যত্র যান। এই পোস্টটি আমার বহু পুরোন বন্ধু শ্রী আয়ুষ গুপ্তাকে উৎসর্গ করলাম।

১১ই ডিসেম্বর ২০১৩। সারা ভারতে লক্ষ লক্ষ ভিন্ন যৌনতার (alternate sexuality) মানুষ রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করছিলেন ঐ দিনটির। কারণ ২০০৯ সালে ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার কিছু প্রয়োগকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে যে রায় দিয়েছিলেন দিয়েছিলেন দিল্লী হাইকোর্ট, তারই আপিল মামলার রায় বেরোনোর কথা ঐ দিন। কিন্তু তাঁদের হতাশ করে শীর্ষ আদালত জানালেন যে ৩৭৭ ধারা সংবিধানসম্মত। ৩৭৭ ধারা বলে যে ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ যৌনাচরণ দন্ডনীয়। দিল্লী হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল যে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যখন স্বেচ্ছায় এই ভিন্ন যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হন, সে ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারা প্রয়োগ করলে সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ ধারার লঙ্ঘন হয়। এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে স্বেচ্ছাকৃত সমকামী যৌনমিলন আর অপরাধ বলে গণ্য হতনা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায় হাই কোর্টের রায়কে নাকচ করে দেয়। সমকামীতা আবার অপরাধের পংক্তিভুক্ত হয়। এর স্বপক্ষে ও বিপক্ষে বহু লেখালেখি হয়েছে। দুই পোস্টে বিভক্ত এই প্রবন্ধে আমি এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত তুলে ধরছি।

উপরোক্ত মামলায় এক পক্ষে (প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষ ভাবে) ছিলেন বেশ কয়েকটি রক্ষণশীল ধর্মীয় বা ধর্ম-ঘেঁষা সংগঠন। অন্য পক্ষ নাজ ফাউন্ডেশন বলে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যাঁরা এই ভিন্ন যৌনতার মানুষের স্বার্থে কাজ করে থাকেন। ফরিয়াদি পক্ষের অভিযোগ মূলতঃ তিনটি:
১) সমকামীতা অস্বাভাবিক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ।
২) এটা ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী।
৩) তাই সমকামীতা দন্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত।

Continue reading