আবার বছর তিরিশ পরে

বছরের কয়েকটা দিন আমি চেষ্টা করি একেবারে ‘অফলাইন’ হয়ে যেতে। মানে পারতপক্ষে ইমেল খুলিনা, নেটে ঘোরাফেরা করিনা। নেহাত জরুরি কিছু না হলে ফোনটাও ধরিনা। মোটামুটি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকি। সারাবছর ধরে সর্বক্ষণ ‘কানেক্টেড’ আর ‘প্লাগ্ড ইন’ থাকার পর এই ক’টা দিনের মূল্য আমার কাছে অসীম। গত বছর পুজোর ক’টা দিন কলকাতায় কাটিয়েছিলাম প্রায় এরকম ভাবে। আর সেই সূত্রেই দেখা হল বহু পুরোন কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে। সেই বন্ধুদলের নবীনতম সদস্যটির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল প্রায় তিরিশ বছর আগে। ১৯৮৫ সালে।

Continue reading

জন্মদিন

২০১৪ সালের গোড়ায়, আর পাঁচটা বছরের মতই, কয়েকটা সঙ্কল্প করেছিলাম। বলা বাহুল্য, জানুয়ারি মাস পেরোতে না পেরোতেই তার মধ্যে অনেক কটার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, একবছর পেরিয়ে এসে দেখছি যে কয়েকটা ধোপে টিকে গেছে, অন্তত আংশিক ভাবে।

সঙ্কল্পগুলোর মধ্যে একটা ছিল বাংলায় লেখালেখি শুরু করা। বাংলা উইকিপিডিয়াতে নিয়মিত লেখা, বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা, মানে টেকনিকাল প্রবন্ধ লেখা। আর নিজস্ব একটা ব্লগ লেখা। উইকিপিডিয়াতে লিখেছি বটে, তবে অত্যন্ত সীমিত। কয়েকটা নিবন্ধে কিছু বানান টানান ঠিক করা, দু-এক লাইন জুড়ে দেওয়া, ব্যস। এর বেশি আর এগোয়নি। কয়েকটা ইংরিজি নিবন্ধকে বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু মাঝপথে পৌঁছে সময় আর ইচ্ছার নিতান্ত অভাব হওয়ায় সে কাজও এগোয়নি। তাছাড়া কোন শক্ত বিষয়ে (অবশ্যই কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ক, আমার বিদ্যে ওর বেশি এগোয়না) লিখতে গিয়েই দেখছি যে বাংলায় টেকনিকাল পরিভাষার বড় অভাব। নিজে পরিভাষা তৈরী করে নেওয়া যায় বটে। ইংরিজিতে ব্যবহৃত টেকনিকাল শব্দগুলোরও নিশ্চয়ই শেক্সপীয়ারের যুগে অস্তিত্ব ছিলনা। ওগুলো কালের নিয়মে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরী হয়েছে। বাংলায় সেরকম করতে কোন বাধা নেই। শব্দভান্ডারে টান পড়লে নতুন শব্দ তৈরী করে নেওয়া যায়, বা পুরোন শব্দের নতুন অর্থ দেওয়া যায়। কিন্তু একটা মোটামুটি সর্বজনগ্রাহ্য আনকোরা নতুন পরিভাষা তৈরী করে নিতে অধ্যবসায় লাগে, আর লাগে বুকের পাটা। দুটোর একটাও যে আমার পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই সেটা স্বীকার করতে অসুবিধে নেই।

Continue reading

আর আমার বিশ্বাসে আঘাত লাগেনা বুঝি?

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ছবিটা আমি নিয়েছি ধর্মকারী থেকে।

গত কিছুদিনের মধ্যেই দুটো ঘটনা মনটাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়ে গেল। প্রথম ঘটনা হিন্দী ছবি pk বন্ধ করার জন্য হিন্দুত্ববাদীদের মারদাঙ্গা ভাঙচুর। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা প্যারিসে। শার্লি এবদো পত্রিকার অফিসে বর্বরোচিত হামলা, যার বলি দশজন নিরস্ত্র সাংবাদিক ও চিত্রশিল্পী। দুটো ঘটনা এক নয়। প্রথমটাতে অন্তত কেউ হতাহত হননি। আর শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে pk সারা বিশ্বে রমরমিয়ে চলছে। মানুষ ভাঙচুরের জবাব দিয়েছেন দলে দলে সিনেমা হলে ভিড় জমিয়ে। লাঠির বদলা সিনেমার টিকিট। মানে একটা সভ্য সমাজে প্রতিবাদ যেরকম ভাবে হওয়া উচিত, মানুষ এই ধর্মের ষাঁড়েদের জবাব দিয়েছেন ঠিক সেইভাবে। দ্বিতীয় ঘটনাটাকে কিন্তু অত সহজভাবে নিতে পারছিনা, কারণ এটার আগাগোড়া রক্তে মাখামাখি।

Continue reading

ভঙ্গদেশের রঙ্গকথা – ২

(আমার মেয়ের সঙ্গে একটি সত্যিকারের ‘বাবা, গল্প বল’ সেশন এই লেখাটার অনুপ্রেরণা। #Hokkolorob #হোককলরব এর প্রতি আমার আন্তরিক কিন্তু অক্ষম সমর্থন। প্রথম পর্বটা পাবেন এখানে।)

— বাবা, আজ কিন্তু পুরো গল্পটা বলতেই হবে। নইলে যেতে দেব না।

— হ্যাঁ রে, আজ পুরোটাই বলব। কাল কোন অবধি বলেছিলাম যেন?

— ওই যে, দিদি হয়ে গেল দেশের রাণী। কিন্তু তারপর কী হল? আর ওই ভিডিওর দিদিটাকেই বা মারছিল কেন পুলিশকাকুগুলো?

— হুঁ, মনে পড়েছে। ঠিক আছে, তারপর কী হল বল তো? দিদি তো হয়ে গেল রাণী। তাই দেখে সব্বাই কী খুশি! এতদিনে একজন মনের মত মানুষ সিংহাসনে বসেছে। সে আমাদেরই মত গরীব, কিন্তু ভয়ঙ্কর তার সাহস, আর তেমনই সৎ।

— সৎ মানে?

— সৎ মানে ভাল মানুষ — যে মিথ্যে কথা বলেনা, চুরি করেনা, কারুর ক্ষতি করেনা। তা সে রাণী সত্যিই গরীব ছিল, অন্তত লোকে তাই ভাবত। সাহসী তো সে ছিলই। আর কেউ তাকে কোনদিন চুরি চামারি করতেও দেখেনি। রাণী সিংহাসনে বসেই বলল, এতদিন যা হয়েছে তা হয়েছে, কিন্তু এবার আমি সব ঝেঁটিয়ে সাফ করব। আর কোন পেয়াদা গুমখুন করবেনা। কারুর বাড়িতে লেঠেল যাবেনা। সবাই ভালভাবে বাঁচতে পারবে।

Continue reading

মোটরবাইকে লাদাখ ভ্রমণ প্রস্তুতি – কিছু জ্ঞানগর্ভ উপদেশ

এটা গুরুচন্ডা৯-তে লেখা একটা টই থেকে কপি-পেস্ট করা। আলোচনা প্রশ্নোত্তর পর্বগুলো বাদ দিয়েছি। শুধু আমার জ্ঞানদানটাই তুলে ধরলাম এখানে। টেকনিকাল কচকচিতে ভর্তি, তাই নেহাৎ মোটরবাইকে লাদাখ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান না থাকলে এটা পড়ার প্রয়োজন নেই। টই-তে হারিয়ে যাবে বলে এখানে তুলে রেখে অমরত্ব প্রদান করলাম। 🙂

Continue reading

সরল ধর্ষণ শিক্ষা

— মশায়ের নামটা কী?

— আজ্ঞে অধমের নাম শ্রী পাপোষ মাল।

— বাঃ বাঃ, নামেও মাল, চেহারাটাও বেশ লগনচাঁদ মাল। আপনি তো বেশ মালদার পার্টি দেখছি মশায়!

— এই আপনাদের আশীর্বাদে টু-পাইস করে খাচ্ছি আর কি। …

— তা নামটা কি পিতৃদত্ত?

— আরে দাদা এই বাজারে কি পিতৃদত্ত আলুভাতে নাম নিয়ে চটক দেখানো যায়? বিজ্ঞাপনে সে নাম লিখলে কেউ ফিরে তাকাবে? নিজের নামটা তাই নিজেই ঠিক করতে হয়েছে আর কি …

— জব্বর নাম রেখেছেন মশায়। আপনার বইয়ের নামের সঙ্গে বেশ খাপ খেয়েছে।

— আজ্ঞে যা বলেন। … (সঙ্গে দেঁতো হাসি)

Continue reading

বিরহ

বিবিজান চলে যান লবেজান করে। সৈয়দ মুজতবা আলির মতে (‘দেশে বিদেশে’ দ্রষ্টব্য) এই প্রবাদটির রচয়িতা কোন প্রেমিক। দিওয়ানা না হলে সাধারণ মানুষ খামোখা বিবিজানের বিহনে লবেজান হবেন কেন?

আলি সায়েব ঋষিতুল্য মানুষ। তাঁর কথা যদি সত্যি বলে ধরে নিই, তাহলে মানতেই হয় যে এই বুড়ো বয়সে পৌঁছে আমি প্রলেতারিয়া শ্রমিক শ্রেণী (তা হোক না বুদ্ধি শ্রমিক) থেকে বেমালুম বুর্জোয়া প্রেমিক শ্রেণীতে প্রোমোশন পেয়েছি। প্রলেতারিয়ারা প্রেমিক হতে পারে কিনা সে সম্বন্ধে মার্ক্স সায়েব কী বলেছেন সেটা ঠিক জানিনা। তবে আমাদের গল্প উপন্যাসের প্রেমিকপ্রেমিকাকুল নিতান্তই পাতি বুর্জোয়া। পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় মহব্বতের বুলি আওড়ানোটা বুর্জোয়াদের মনোপোলি। প্রলেতারিয়ার কাছে প্রেম হল ঝলসানো রুটি।

স্বাভাবিক নিয়মে এই প্রোমোশনটা পেয়ে দিলখুশ হওয়ার কথা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমার দিল থেকে খুশি বিলকুল বেপাত্তা। মন আনচান। চিত্তে সুখ নেই।

Continue reading

দ্বিতীয়

১। ১লা ফেব্রুয়ারি সকাল — প্রজাপতি

— ‘বাবা, বাবা! দেখো কী সুন্দর দু’টো প্রজাপতি!’

টুনাইয়ের গলা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বিবেক। সত্যিই ঘাসের ওপর ফুরফুর করে উড়ে বেড়াচ্ছে দুটো অপূর্ব সুন্দর প্রজাপতি। হলুদ পাখার ওপর লাল ছোপ ছোপ। হুবহু একই চেহারা দুটোর। টুনাই কিছুক্ষণ তাড়া করে বেড়াল দুটোকে। তারপর একসময় তারা কোথায় উড়ে গেল। টুনাই মেতে গেল অন্য খেলায়।

এ বাড়িটাতে আসা অবধি এই একটা মস্ত লাভ হয়েছে বিবেক আর অর্পিতার। টুনাইয়ের একটা খেলে বেড়াবার জায়গা জুটেছে। বাড়ির চারপাশে বেশ কিছুটা বাগান, তাতে প্রচুর গাছ গাছালি ঝোপ ঝাড়। টুনাই সারাদিন এই ঘাসেই খেলা করে বেড়াচ্ছে, বাড়ির ভেতরে আসার নামও নেয়না। অর্পিতা কিছুটা হাঁফ ছাড়ার ফুরসৎ পেয়েছে তাই। টুনাইয়ের জন্মের পর এই বোধহয় প্রথমবার।

Continue reading

জুলে! — ৭

[ জুলে! — ১ ]
[ জুলে! — ২ ]
[ জুলে! — ৩ ]
[ জুলে! — ৪ ]
[ জুলে! — ৫ ]
[ জুলে! — ৬ ]
আমাদের লাদাখ ভ্রমণের সপ্তকান্ড রামায়ণের ইতি টানছি এই পর্বে।

।। ৭-৮ জুলাই — প্রত্যাবর্তন ।।

প্যাঙ্গং সো থেকে ফেরার পর আরো দিন দুয়েক আমরা ছিলাম লেহ-তে। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। বাইকদুটো ফেরত দিয়েছি। বাইকওয়ালা তার দুই পাড়ার দাদাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল লেহ-তে, বাইক নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাজারের কাছে একটা গলিতে দেখা করে বাইক হস্তান্তর করলাম। বিস্তর চোখা চোখা কথা আর বেঁকা হাসি সহ্য করতে হল, কিন্তু কী আর করা? পাঁকে যখন পড়েছি, তখন দু একটা চামচিকের লাথি সহ্য করা ছাড়া তো গতি নেই। আক্কেল সেলামিও দিতে হল একগাদা। আমাদের সফরের খরচা বেড়ে গেল একলাফে অনেকটা। এটাও মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। পাড়ার দাদা দুটির চেহারা দেখে বুকে খুব একটা বল ভরসা জাগেনা। বেমক্কা পাঙ্গা নিয়ে নিলে ছোরাছুরি বার করাটা তাদের পক্ষে মোটেই অসম্ভব বলে মনে হলনা। গচ্চাটা দিয়ে মানে মানে সটকে পড়লাম আমরা।

খার্দুং-লা’তে বরফের আইসিকলস।

খার্দুং-লা’তে বরফের আইসিকলস।

এ ছাড়া একটা গাড়িতে কয়েকজনের সঙ্গে শেয়ারে গিয়ে খার্দুং-লা ঘুরে এলাম। বেজায় বরফ আর ততোধিক ঠান্ডা। জীবনে প্রথমবার নিজের চোখে ‘আইসিকল’ দেখলাম খার্দুং-লা তে। কিন্তু এ গল্পের বিশদে যাচ্ছিনা।

Continue reading

জুলে! — ৬

[ জুলে! — ৫ ]

।। ৩রা-৪থা জুলাই — প্যাঙ্গং সো ।।

পরদিন সকালে ন’টা নাগাদ আমরা আবার রওনা দিলাম। বাইকওয়ালা ইতিমধ্যে কিছু জানায়নি, কাজেই বাইক দুটো আরো দিন দুয়েক আমরা রাখতে পারব। এবারের গন্তব্যস্থল লাদাখের অন্যতম প্রধান দ্রষ্টব্য, প্যাঙ্গং সো। মালপত্র সবই মোটামুটি গেস্ট হাউসেই রেখে এসেছি। সঙ্গে শুধু দুদিন চালানোর মতো জামাকাপড় আর বাইকের যন্ত্রপাতি।

সো শব্দের অর্থ হ্রদ। প্যাঙ্গং একটি সুবিশাল নোনা জলের হ্রদ। লম্বায় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। চওড়া অবশ্য খুব একটা বেশি নয়, সব থেকে চওড়া অংশ আন্দাজ পাঁচ কিলোমিটার । হ্রদের অধিকাংশটাই (প্রায় ৯০ কিলোমিটার) চীনের মধ্যে পড়ে। লেহ থেকে প্রায় ঘন্টা পাঁচেকের রাস্তা, সঠিক দূরত্বটা ভুলে গেছি। উপশী হাইওয়ে ধরে শে ছাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে কারু বলে একটা জায়গা পড়ে, সেখান থেকে বাঁ দিকে ঘুরতে হয়। এরপর মাঠের মধ্যে দিয়ে এঁকা বেঁকা সরু পথ। রাস্তার অবস্থা খুবই ভাল, খানা খোঁদল চোখে পড়েনা বললেই চলে। মাঠ আবার সমতল নয়, উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো। সেই ঢেউয়ের মাঝে রাস্তা যায় হারিয়ে। কোন দিকে যে সে চলেছে, দূর থেকে বোঝার উপায় নেই। মনে হয় এরপর বুঝি আর রাস্তাই নেই। এদিকটাতে প্রচুর গাছ গাছালি, ক্ষেত খামার আছে। চারিদিক সবুজে সবুজ। সেই ঢেউ খেলানো প্যাঁচালো রাস্তা দিয়ে আমরা দুলকি চালে চারিদিকের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম।

Continue reading