আবার বছর তিরিশ পরে

বছরের কয়েকটা দিন আমি চেষ্টা করি একেবারে ‘অফলাইন’ হয়ে যেতে। মানে পারতপক্ষে ইমেল খুলিনা, নেটে ঘোরাফেরা করিনা। নেহাত জরুরি কিছু না হলে ফোনটাও ধরিনা। মোটামুটি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকি। সারাবছর ধরে সর্বক্ষণ ‘কানেক্টেড’ আর ‘প্লাগ্ড ইন’ থাকার পর এই ক’টা দিনের মূল্য আমার কাছে অসীম। গত বছর পুজোর ক’টা দিন কলকাতায় কাটিয়েছিলাম প্রায় এরকম ভাবে। আর সেই সূত্রেই দেখা হল বহু পুরোন কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে। সেই বন্ধুদলের নবীনতম সদস্যটির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল প্রায় তিরিশ বছর আগে। ১৯৮৫ সালে।

সে গল্পটাই নাহয় আজ বলা যাক। কিন্তু তার আগে, ভূমিকাস্বরূপ একটু পুরোন কাসুন্দি ঘাঁটব। মানে ঘাঁটতেই হবে। না ঘাঁটলে গল্প জমবেনা। ঘটনাচক্রে আমি ছোটবেলায় কয়েকটা বছর কাটিয়েছি বিদেশে। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে। বাবা মা কয়েক বছর ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে কাজ করেছেন। সেই সূত্রে। আমার জন্ম কলকাতায়। কিন্তু বিদেশ চলে গিয়েছিলাম খুবই ছোট বয়েসে। যখন আবার ফিরলাম, ততদিনে কলকাতার সব স্মৃতি মন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ। তাই তখন মনে হয়েছিল একেবারে আনকোরা নতুন দেশে এসে হাজির হয়েছি। সব কিছুই অজানা, অচেনা। এ দেশে না আছে চওড়া রাস্তাঘাট, না আছে বড় বড় গাড়ি। এয়ারকন্ডিশন নেই। থাকার মধ্যে আছে বিশ্রী ভিড় আর ধুলো কাদা। সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় আমাদের বাড়িতে উঠতে হয়। লিফট নেই। বাথটাব নেই। বাথরুমে কমোড নেই। ওভেন নেই। সব চেয়ে বড় ব্যাপার যে বাড়িতে টিভিও নেই। মোটামুটি দেখে শুনে বেশ ব্যোমকে গেছিলাম আর কি। মনে মনে ভাবতাম যে বাবা মা আমাকে এ কোন পচা জায়গায় এনে ফেলল? কালচার শকটা বেশ ভাল মত লেগেছিল। কয়েকটা ছোট উদাহরণ দিই।

লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকতে টেনিস খেলা এন্তার দেখেছি, কিন্তু ব্যাডমিন্টন একেবারেই নয়। সে আমলে অ্যামেরিকাতে ব্যাডমিন্টন বস্তুটি প্রায় অজানা ছিল। এখনো ব্যাডমিন্টন খেলে মূলত এশীয়রা। খাঁটি অ্যামেরিকানদের ব্যাডমিন্টনে খুব একটা রুচি নেই। এদিকে দেশে প্রকাশ পাড়ুকোনে তখনো খ্যাতির মধ্যগগনে। কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিন্টনের চাষ। প্রথম যেদিন পাড়ার দাদা দিদিদের ব্যাডমিন্টন খেলতে দেখলাম, একেবারে আঁতকে উঠলাম। টেনিসের সঙ্গে ওপর ওপর একটা সাদৃশ্য আছে বটে। নেট আছে, রাকেট আছে। কিন্তু ওই কি রাকেটের ছিরি? কাঠির মত সরু সরু! আর বলের বদলে ঝাঁটার মত ওটা কী নিয়ে খেলছে ওরা? দেখে একেবারে তাজ্জব বনে গেছিলাম, এখনো মনে আছে।

ক্রিকেট খেলা দেখেও একই অবস্থা। বেসবল আগে অনেক দেখেছি। কিন্তু ক্রিকেটের ব্যাট দেখে আমি থ। এত চওড়া ব্যাট দিয়ে তো বাচ্চা ছেলেও বল মারতে পারবে! এ আবার কী খেলা! শুধু লস অ্যাঞ্জেলেসে আমাদের পাড়ায় অনেক মেক্সিকান থাকার কারণে ফুটবল জিনিসটার সঙ্গে ভালই পরিচয় ছিল, তাই বাঁচোয়া। বাঙালির প্রাণের খেলাটা দেখে আর অবাক হতে হয়নি।

আমিও ওদিকে আমার আচার আচরণে অনেকের হাসির খোরাক জুগিয়েছি। খেয়ে উঠে ন্যাপকিন খুঁজতে গিয়ে ঠাকুমার বকুনি খেয়েছি। মাছের কাঁটা বাছা ব্যাপারটা কয়েকবার চেষ্টা করে একেবারে অসম্ভব ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছি। অথচ আমার সমবয়সী তুতো ভাই বোনেরা মাছ কেন, মাছের মুড়ো অবধি বেছে খেয়ে নিত আর আমায় দেখে করুণার হাসি হাসত। ভাত খেতে অরুচি। খেতে বসে টর্টিলার খোঁজ করি, ম্যাকডোনাল্ডসের বার্গার বা কোকাকোলা খাবার জন্য বায়না করি। রাস্তায় বেরিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করি, ‘বাবা, এখানে কি সব গাড়িই ট্যাক্সি?’ (এই শেষ ব্যাপারটার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। লস অ্যাঞ্জেলেসে যে মডেলের গাড়ি ট্যাক্সি হত, প্রাইভেট গাড়ি সে ব্র্যান্ডের দেখা যেতনা। হলুদ রঙ না দেখলেও ব্র্যান্ড দেখেই ট্যাক্সি আলাদা করে নেওয়া যেত। তাছাড়া প্রাইভেট গাড়ির রঙও হত হরেক রকমের — লাল, নীল, সাদা, সবুজ। এদিকে কলকাতায় সবই অ্যাম্বাস্যাডার, রঙ বলতে সাদা, কালো আর হলুদ-কালো। মারুতি ৮০০ তখনও বেরোয়নি। বৈচিত্র প্রায় নেই বললেই চলে। অতএব প্রশ্ন।)

ইংরিজি বলাটা শিখেছিলাম বিদেশে। সেই কারণে ইংরিজি বলতাম খাঁটি অ্যামেরিকান অ্যাকসেন্টে। কলকাতায় আমাদের পাড়ায় বহু দক্ষিণ ভারতীয়ের বাস ছিল। তাঁরা সবাই পরিষ্কার বাংলা বললেও নিজেদের মধ্যে অনেক সময়ই ইংরিজিতে কথা বলতেন। আর তাঁদের ইংরিজি জ্ঞানটাও গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে বেশি ছিল। দুজন দক্ষিণ ভারতীয় দিদি আমার অ্যাকসেন্ট শুনে মজা পাওয়ার জন্য আমার সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলত। এদিকে আমি ছিলাম রাম লাজুক। কখনো কথা বলতাম, কখনো লজ্জায় চুপ করে থাকতাম। সৌভাগ্যের বিষয়, অনভ্যাসের কারণে মাস দুয়েকের মধ্যেই সে অ্যাকসেন্টে মরচে পড়তে শুরু করে। আর বছর দুয়েকের মধ্যে ইংরিজির জ্ঞানটাই মোটামুটি গুলে খেয়ে ফেলেছিলাম। ইংরিজিতে কথাবার্তা চালানোর ব্যাপারটা আবার কেঁচে গন্ডুষ করতে হয়েছিল কলেজে ঢুকে।

ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে, মানে যে গল্পটা বলতে শুরু করেছিলাম সেটাতে। বিদেশে থাকার দরুণ আমার বেশ কিছু খেলনা ছিল যা তখন এ দেশে হয় পাওয়া যেতনা, নয় পাওয়া গেলেও দাম ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ বিদেশে সেসব জিনিস সবাই কিনতে পারে। তার মধ্যে ছিল একটা ক্যাটারপিলার চাকা ওয়ালা ট্যাঙ্ক, যেটা সত্যি সত্যিই ছোটখাট বাধা বিপত্তি পেরোতে পারত। খাটের ওপর ছেড়ে দিলে ক্যাটারপিলার হুইলের সাহায্যে দিব্যি বালিশটালিশ ডিঙিয়ে চলে যেত। ছিল একটা ছোটখাট ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্টের টাউন মডেল। সেলুন, ঘোড়ার আস্তাবল, চার্চ — সব। সঙ্গে অনেকগুলো ক্ষুদে ক্ষুদে কাউবয় আর রেড ইন্ডিয়ান যোদ্ধা। একজোড়া চামড়ার হোলস্টার আর বেল্টশুদ্ধু রূপোলি নল আর সাদা হ্যান্ডেলওয়ালা প্রমাণ সাইজের কাউবয় পিস্তল। ওগুলো দিয়ে ক্যাপ ফাটানো যেত। আমি কোমরের দুদিকে দুই পিস্তল ঝুলিয়ে দাদু ঠাকুমা নামক দুই রেড ইন্ডিয়ান দস্যুবধ করতাম নিত্যিদিন।

তবে আমার প্রাণাধিক প্রিয় যে জিনিসটা ছিল, সেটা হল একজোড়া লেগো সেট। একটা একেবারে ছোটদের জন্য, অন্যটা একটু বড়দের জন্য। কিছুদিন আগে এই লেগো সেট নিয়ে একটা সিনেমা হয়েছে (নাম ‘দ্য লেগো মুভি’)। আমার বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবের লেগোর সঙ্গে প্রথম পরিচয় সিনেমাটার মাধ্যমে। কারণটা স্বাভাবিক। আমাদের ছোটবেলায় লেগো বস্তুটি এ দেশে প্রায় অজানা ছিল। এখন পাওয়া যায় সব খেলনার দোকানেই। তবে যাদের বাচ্চা কাচ্চা নেই তাদের আর খেলনার দোকানে যাওয়ারই বা কী প্রয়োজন, আর গেলেও বা একটি বিশেষ খেলনার ওপরই নজর পড়বে কেন?

লেগো জিনিসটা ভারি অদ্ভুত। ছোট ছোট রঙবেরঙের ইঁটের মত চেহারা। ইঁটের একদিকে ছোট্ট ছোট্ট সমান সাইজের ঢিপি রয়েছে সার দিয়ে, আর অন্য পাশে রয়েছে সেই ঢিপির সাইজের গর্ত। একটা ইঁটকে অন্য ইঁটের সঙ্গে জুড়তে হলে সেই ঢিপিগুলোকে ওপরের ইঁটের গর্তের মধ্য লাগিয়ে দিতে হয়। ইঁটগুলো হরেক আকারের — চৌকো, লম্বা, টালির মত, ইত্যাদি। তাদের জুড়ে জুড়ে বানিয়ে তোলা যায় নানা রকমের জিনিস। বাড়ি, গাড়ি, এরোপ্লেন, মায় মহাকাশযান অবধি। ইঁট ছাড়াও রয়েছে ছোট ছোট মানুষ, গাড়ির চাকা, জানলা দরজার পাল্লা, গাছ, ইত্যাদি। খেলাটা একবার ভাল লেগে গেলে একেবারে নেশার মত পেয়ে বসে। সময়ের খেয়াল থাকেনা, ঘন্টার মত ঘন্টা খেলে যেতে হয়। খালি মনে হয়, নতুন আর কী বানানো যেতে পারে। যেটুকু সময় বাড়িতে থাকতাম, তার অর্ধেকই বোধহয় খরচ হত লেগোর পেছনে। এ খেলায় আমার সঙ্গী ছিলেন দাদু। তিনি তাঁর বার্ধক্যজনিত গাম্ভীর্যের খোলসটা সযত্নে তুলে রেখে পরম উৎসাহে আমার সঙ্গে খেলায় মেতে উঠতেন। দাদুর প্রয়োজনও পড়ত মাঝে মাঝেই। দুটো ইঁট, বিশেষ করে পাতলা ইঁটগুলো, শক্তভাবে একে অন্যের সঙ্গে এঁটে গেলে তাদের ছাড়াবার সময় আমার গায়ের জোরে কুলোতনা কখনো সখনো। দাদুর শরণাপন্ন হতে হত। বানাতাম বাড়ি, রেলগাড়ি, রেল স্টেশন, রেললাইন, আরো কত কী!

লেগো খেলনাটার উৎপত্তি ডেনমার্কে। এক ছুতোর মিস্ত্রী, যে কাঠের খেলনা বানাতো, আবিষ্কার করেছিল এই প্ল্যাস্টিকের ইঁট জিনিসটা। প্রথম লেগোর ইঁট তৈরী হয় ১৯৪৯ সালে। আর লেগো ইঁটের আধুনিক অবতারের প্রথম আবির্ভাব ঘটে ১৯৫৮ সালে। ইঁটগুলো শক্ত প্লাস্টিকের তৈরি। হাতুড়ি মেরে না ভাঙলে বা আগুনে না ফেলে দিলে ও জিনিসটা প্রায় অজর অক্ষয় — কোনদিন নষ্ট হবার নয়। রঙটাও পাকা। সাবান জলে হাজার ধুলেও ও রঙ উঠবেনা। তবে সব থেকে মজার জিনিস হচ্ছে এই যে ১৯৫৮ সালে তৈরি লেগোর ইঁটের সঙ্গে কালকের তৈরি লেগোর ইঁট একেবারে খাপে খাপে জোড়া লেগে যাবে। একচুল এদিক ওদিক হবেনা। প্রতি বছরই কিছু কিছু নতুন আকৃতির ব্লক আসে। তবে মূল কাঠামোটা একই থাকে। নতুন ব্লকগুলোও পুরোনর সঙ্গে জোড়া লাগে নিখুঁত ভাবে।

এত অদ্ভুত সুন্দর জিনিস, কিন্তু দেশে দুর্লভ। কাজেই ও জিনিসটা আমার অনেক তুতো ভাইবোনের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমিও পারলে কারুর হাতে ও জিনিসটা দিতামনা। এক ভাই তো বাড়ি গিয়ে নাকি এমন বায়না জুড়েছিল যে তার বাবা বাধ্য হয়ে নিউ মার্কেট থেকে একটা নকল দেশি লেগো জাতীয় জিনিস কিনে এনেছিলেন। সেটা এতটাই বাজে কোয়ালিটির ছিল যে দেখে আমি হেসে কুটিপাটি, আর ভাই রেগে টঙ।

আমার কাছে যে লেগোর সেটটা ছিল, তাকে বলা যেতে পারে ‘জেনারাল পার্পাস’, বা সকল কাজের কাজী। নানা আকৃতির ইঁট আর আনুষঙ্গিক জিনিস রয়েছে। তাই দিয়ে যা ইচ্ছে বানিয়ে নাও। এছাড়াও কিছু ‘স্পেশাল পার্পাস’ লেগো সেট পাওয়া যায়, যা দিয়ে বিশেষ কিছু একটা বানানো যায়। যেমন একটা সেট আছে বিমানবন্দর বানানোর জন্য। সেই বিমানবন্দর বানাতে কাজে লাগবে এমন কিছু বিশেষ আকৃতির ব্লক থাকে সেই সেটে, যেসব আমার সকল কাজের কাজীতে নেই। আমার মনে মনে ইচ্ছা ওরকম একটা স্পেশাল পার্পাস সেট জোগাড় করা। কিন্তু পাব কোথায়?

ভগবান বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন। বিদেশ থেকে ফেরার কয়েক বছরের মধ্যেই একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে বাবা মা কে আবার পাড়ি দিতে হল অ্যামেরিকা। এবার অবশ্য মাত্র সপ্তাহখানেকের জন্য। কিন্তু তাতে কী হল? যাচ্ছেন তো লস অ্যাঞ্জেলেস, যেখানে দোকানপত্তর সবই চেনা। একটু সময় বার করে কি একবার খেলনার দোকানে ঢুঁ মারতে পারবেননা? আর ঢুঁ মেরে একটা লেগো সেট কিনতে আর কতক্ষণ সময় লাগে? ভয়ে ভয়ে প্রস্তাবটা পাড়লাম বাবার কাছে। বাবা শুনেই নাকচ করে দিলেন।

— না, না! ও অনেক দাম। ওসব হবেনা।

— কেন, আগে তো কিনে দিয়েছিলে। তখন বুঝি দাম ছিলনা?

— তখন অ্যামেরিকান মাইনে পেতাম, এখন ভারতীয় মাইনে পাই। দুটোর মধ্যে তফাৎ আছে। এখন ভাগ এখান থেকে।

— কত তফাৎ? বাকিটা যদি আমি দিয়ে দিই?

— মানে? তুই কোত্থেকে দিবি আবার!

— কেন, আমার পয়সার কৌটোটাতে তো দু বছর ধরে পয়সা জমছে। ওটায় যা আছে তাতে হবেনা?

বাবা থ। ছেলে বলে কী? এখন থেকেই পয়সার জ্ঞান টনটনে! কিন্তু আমি নেহাত নাছোড়বান্দা হওয়ায় শেষ অবধি নিয়ে আসা হল কৌটো। কৌটোটাও বিদেশ থেকে আনা। মাটির নয়। সুন্দর দেখতে একটা প্ল্যাস্টিকের কিউবের আকারের বাক্স। খুব কায়দা করে ওপরটা খুলতে হত। খুলে দেখা গেল যে দু’বছরে তার মধ্যে জমেছে প্রায় চারশো টাকা। অত টাকা জমার কারণ এই যে বাবা সবসময় আমাকে আট আনা, এক টাকা বা দু’টাকার কয়েনগুলোই দিতেন। পাঁচ-দশ-কুড়ি-পঁচিশ পয়সার কয়েন নয়। তাই চারশো টাকা বাক্সের মধ্যে এঁটে গেছিল। সেটা ১৯৮৫ সাল। তখন চারশো টাকার অনেক দাম। ডলারের হিসেবেও প্রায় কুড়ি-পঁচিশ ডলার। টাকাগুলো দিয়ে দিতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। টাকার পরিমাণটা দেখে ওটা নিয়ে মনে মনে কিছু ভবিষ্যত পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলাম। মা’ও একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন। কিন্তু বাবা অনড়। বললেন যে, ওর শেখা দরকার যে ভাল কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। এই টাকা দিয়েই ওর লেগো কেনা হবে। এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এখন ভাবতে বসলে বুঝি শিক্ষাটা কতটা মূল্যবান ছিল। এমন নয় যে বাবা ওই টাকাটা না নিয়ে লেগো কিনতে পারতেননা। খুব সম্ভবত লেগো সেটটা কিনতে ওর থেকে বেশি টাকাই লেগেছিল। কিন্তু ওই একটি শিক্ষাতেই মনে হয়েছিল হঠাৎ করে এক লাফে যেন বড় হয়ে গেছি। অনেক বড়। নিজের টাকায় নিজের জিনিস কিনতে পারার মত বড়।

যথাসময়ে বাবা মা ফিরলেন। সঙ্গে লেগোর সেট। স্পেশাল পার্পাস সেট, পোষাকি নাম ‘লুনার এক্সপ্লোরেশন ভেহিকল’। মানে চাঁদের ওপর চলবার গাড়ি। অনেকটা টিনটিনের গল্লের চাঁদের ট্যাঙ্কের মত চেহারা। মানুষগুলোর জন্য মহাকাশচারীর সাজ। হেলমেট, অক্সিজেন সিলিন্ডার, সব আছে। আর আছে অনেক রকম অদ্ভুত চেহারার ব্লক, যা দিয়ে সেই এক্সপ্লোরেশন ভেহিকলের বিভিন্ন অংশ বানাতে হয়। নিজে নিজে বানানো বেশ কঠিন। একটা ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়াল আছে, সেটা দেখে দেখে ব্লকগুলোকে জুড়ে জুড়ে আস্তে আস্তে গড়ে তুলতে হয় পুরো জিনিসটা। আর সেটে একটাও বাড়তি ব্লক নেই। মানে একটা ছোট্ট ইঁটও যদি হারিয়ে যায় তাহলেই সেটটা খুঁতে হয়ে যাবে। প্রথমবার সবকিছু জুড়ে গোটা জিনিসটা বানাতে প্রায় অর্ধেক দিন খরচা হয়েছিল মনে আছে। তারপর কয়েকদিন ধরে মূল গাড়িটা ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট মহাকাশযান বানালাম। খেলা চলতে থাকল।

তারপর আস্তে আস্তে সত্যি করেই বড় হওয়ার পালা। বড় ছেলেমেয়েদের জন্যও লেগো পাওয়া যায়, যেগুলো দিয়ে বড়বড় রিমোট কন্ট্রোলওয়ালা গাড়ি, বা এরোপ্লেন বানানো যায়। কিন্তু সেসব আর পাব কোথায়? তাই লেগো ছেড়ে একসময় মন চলে গেল ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন আর সাঁতারের দিকে। আমার লেগো খেলার সঙ্গী দাদু একসময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন, তারপর একদিন ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন। লেগোর ইঁটগুলো বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে রইল বাড়ির এক কোণায়। তারপর তো গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। আমি কলেজে পড়ার সময় থেকেই কলকাতাছাড়া। বাড়ি বদল হয়েছে। বাবা চলে গেছেন এক সময়ে। আমি কলকাতার পাত্তাড়ি গুটিয়ে ব্যাঙ্গালোর পাড়ি দিয়েছি। এই ঝড়ঝাপটার মধ্যে ছোটবেলার খেলনাগুলো যে কোথায় গেছে সেটা ভাববার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই হয়নি।

ফাস্ট ফরোয়ার্ড করা যাক বছর তিরিশেক। আমার কন্যারত্নের চার বছরের জন্মদিনে ওকে একটা লেগো সেট উপহার দিলাম। এখন জিনিসটা অনেক সহজলভ্য। তবে কিনতে গিয়ে দেখলাম যে সব ওই স্পেশাল পার্পাস সেট। সকল কাজের কাজীকে খুঁজে বার করতে বেশ বেগ পেতে হল। আবার জেনারেল পার্পাস সেট নিয়ে শুরু করলে, আমার ধারণা, খেলাটা বেশি ভাল শিখবে। খুঁজে পেতে একটা বার করলাম। তাতে আমার পরিচিত ব্লকের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন ধরণের ব্লকও ছিল, যেগুলো আগে কখনো দেখিনি। বাপে-মেয়েতে মিলে মহা উৎসাহে লেগে গেলাম লেগোর বাড়ি বানাতে। বাড়ি বানানোর ফাঁকে ফাঁকে ওকে শোনাতে থাকলাম আমার ছোটবেলার লেগো খেলার গল্প। সেসব শুনে মেয়ের আব্দার, আমার খেলনা গুলো দেখবে। যতই বোঝাতে চেষ্টা করি যে সেসবের এখনো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, না হোক তিরিশ বছর তো পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু ‘ও যে মানেনা মানা’। তিরিশ বছর কতটা সময় সে সম্বন্ধেও ওর ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়। মেয়ের আব্দার রাখতেই মা’কে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম যে ছোটবেলার সেই জিনিসগুলো এক আধটা এখনো টিকে আছে কিনা, আর থাকলেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে মা ওয়াকিবহাল কিনা। অবাক করে দিয়ে মা বললেন যে খুব সম্ভবত কয়েকটা এখনো আছে। বাড়ি বদল করার সময় হাতে ঠেকেছিল। উনি যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন কোন একটা ট্রাঙ্কের মধ্যে। একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে। সাধে কি আর বলে, জননী জন্মভূমিশ্চ ?

পুজোর সময় কলকাতার বাড়িতে এসে দর্শন পেলাম কাঙ্ক্ষিত বস্তুগুলির। একটা বন্দুক, আর দুটো সেট লেগো। সকল কাজের কাজী, আর লুনার এক্সপ্লোরেশন ভেহিকল, দুজনেরই দেখা পেলাম। এমনকী দ্বিতীয়টা যে বাক্সে বন্দী হয়ে ভারতে পদার্পণ করেছিল সেটা অবধি রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়ালটাও। মেয়ের আনন্দ দেখে কে! আবার বাপবেটি মিলে লেগে পড়লাম জিনিসটা বানাতে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের অজস্র প্রশ্ন — লোকগুলোর মাথায় হেলমেট কেন, পিঠে ওই সিলিন্ডারের মত জিনিসগুলো কী, ওগুলো কোন কাজে লাগে, ওই হেডলাইটের মত জিনিসটা বা ওই প্লেনের ইঞ্জিনের মত দেখতে জিনিগুলো কী, ওগুলো ওর লেগোতে নেই কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি পাকা ব্যাটসম্যানের মত প্রশ্নের বাউন্সার বিমারগুলোকে এড়িয়ে এড়িয়ে, এক আধটা ডিফেন্সিভ খেলে (মানে সাধ্যমতো জবাব দিয়ে), মাঝে মাঝে এক আধটা হুক-পুল চালিয়ে (মানে ধমক দিয়ে প্রশ্নবাণ বন্ধ করে), একের পর এক ইঁট জুড়ে চললাম। আশ্চর্য! এই তিরিশ বছরে ইঁটগুলোর বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি। একটু ধুলো পড়েছিল। মা পুরো সেটটাকে সাবান জলে চুবিয়ে রোদে শুকিয়ে রেখেছিলেন। কয়েকটা ব্লক এত বছর ধরে একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে থাকার ফলে প্রায় শিকড়বাকড় গজিয়ে ফেলেছিল। সেগুলোকে আলাদা করতে একটু বেগ পেতে হল। টানাটানি করতে হল বিস্তর। তার ঠেলায় একটা ছোট্ট পিস গেল ভেঙে। কিন্তু মোটামুটি সবগুলোই দেখলাম ব্যবহারযোগ্য আছে। আস্তে আস্তে তৈরি হল লুনার এক্সপ্লোরেশন ভেহিকল। এত বছরেরও মাত্র দুটো কি তিনটে ব্লক হারিয়েছে (বোঝা যায় যে ছোটবেলায় কতটা যত্ন করে রাখতাম ওটাকে)। তাই সামান্য খুঁত থাকলেও গাড়িটা প্রায় আস্তই তৈরি হল।

নতুন লেগো

‘এভরিথিং ইজ অসাআআম!’ নতুন লেগো। মেয়ের সম্পত্তি।

পুরোন লেগো

তিরিশ বছরের পুরোন বন্ধু লুনার এক্সপ্লোরেশন ভেহিকল। কলকাতার বাড়ির বারান্দার রোদে। খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে গাড়ির ছাদের একদিকে কয়েকটা লাল হেডল্যাম্পের মত দেখতে জিনিস নেই (মানে ওই পিসগুলো হারিয়ে গেছে)।

ক্লোজ আপ। স্পেসসুট পরা লেগোমানব গাড়ি চালাচ্ছে।

আরেকটা ক্লোজআপ। ডেপথ অফ ফোকাস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম।

‘ফিনিশড প্রোডাক্ট’টা দেখে মেয়ে আহ্লাদে আটখানা। মেয়ের মা বরের কৃতিত্বে ‘সুটেবলি ইমপ্রেস্ড’। বরের মা পুরোন স্মৃতি ঘেঁটে, বরের বাবার কথা ভেবে, আঁখি ছলোছলো। আর আমি? তিরিশ বছরের পুরোন বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া, আর পুরোন বন্ধুত্বটা আবার আনকোরা নতুনভাবে জোড়া লাগাতে পারা, এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী থাকতে পারে?

Advertisements

6 thoughts on “আবার বছর তিরিশ পরে

  1. দারুণ লাগলো। পুরনো বন্ধুর পরিচয়টা যে এরকম হবে, সেটা আন্দাজ করতে পারিনি। 🙂
    লেখাটা খুব ভাল হয়েছে, ছোটবেলা-বড়বেলা মিলিয়ে পুরো জমজমাট। আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পরের কালচার শকগুলো পড়ে খুব মজা পেলাম। 🙂 🙂

    • ইঞ্জিনিয়ার মানুষ তো, তাই মানুষের চেয়ে যন্ত্রপাতি ইঁটপাথরকেই বেশি পছন্দ। 🙂

  2. Oshadharon Tatha… Darun laglo pore! Smriticharona, parenting, shaishab, travelogue – all these and much more. Beautifully nostalgic.

    • এই তো! রোববারের আরামের ঘুমটা খামোখা নস্টালজিয়ার গহ্বরে বিসর্জন দিলেন। 🙂

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s