জন্মদিন

২০১৪ সালের গোড়ায়, আর পাঁচটা বছরের মতই, কয়েকটা সঙ্কল্প করেছিলাম। বলা বাহুল্য, জানুয়ারি মাস পেরোতে না পেরোতেই তার মধ্যে অনেক কটার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, একবছর পেরিয়ে এসে দেখছি যে কয়েকটা ধোপে টিকে গেছে, অন্তত আংশিক ভাবে।

সঙ্কল্পগুলোর মধ্যে একটা ছিল বাংলায় লেখালেখি শুরু করা। বাংলা উইকিপিডিয়াতে নিয়মিত লেখা, বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা, মানে টেকনিকাল প্রবন্ধ লেখা। আর নিজস্ব একটা ব্লগ লেখা। উইকিপিডিয়াতে লিখেছি বটে, তবে অত্যন্ত সীমিত। কয়েকটা নিবন্ধে কিছু বানান টানান ঠিক করা, দু-এক লাইন জুড়ে দেওয়া, ব্যস। এর বেশি আর এগোয়নি। কয়েকটা ইংরিজি নিবন্ধকে বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু মাঝপথে পৌঁছে সময় আর ইচ্ছার নিতান্ত অভাব হওয়ায় সে কাজও এগোয়নি। তাছাড়া কোন শক্ত বিষয়ে (অবশ্যই কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ক, আমার বিদ্যে ওর বেশি এগোয়না) লিখতে গিয়েই দেখছি যে বাংলায় টেকনিকাল পরিভাষার বড় অভাব। নিজে পরিভাষা তৈরী করে নেওয়া যায় বটে। ইংরিজিতে ব্যবহৃত টেকনিকাল শব্দগুলোরও নিশ্চয়ই শেক্সপীয়ারের যুগে অস্তিত্ব ছিলনা। ওগুলো কালের নিয়মে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরী হয়েছে। বাংলায় সেরকম করতে কোন বাধা নেই। শব্দভান্ডারে টান পড়লে নতুন শব্দ তৈরী করে নেওয়া যায়, বা পুরোন শব্দের নতুন অর্থ দেওয়া যায়। কিন্তু একটা মোটামুটি সর্বজনগ্রাহ্য আনকোরা নতুন পরিভাষা তৈরী করে নিতে অধ্যবসায় লাগে, আর লাগে বুকের পাটা। দুটোর একটাও যে আমার পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই সেটা স্বীকার করতে অসুবিধে নেই।

বাকি রইল নিজস্ব ব্লগ লেখা, যাতে থাকবে নিজের মতামত, অভিজ্ঞতা, গল্পগাছা। সেই রিজোলিউশনের ফলশ্রুতি এই ব্লগ। আজ ব্লগের প্রথম জন্মদিন। একবছর পরে দেখছি যে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হলেও এটা বেঁচে আছে বটে। লেখাটা নিয়মিত হয়না কাজের চাপে আর কুঁড়েমির ঠেলায়। অনেক কিছুই লিখব বলে ভাবি। মাথার মধ্যে যে কোন সময়েই অন্তত তিন-চারটে লেখার আইডিয়া ঘোরা ফেরা করে। কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠেনা। অফিসের কাজ শেষ করে যেটুকু সময় বেঁচে থাকে, দিনের শেষে দেখি সেটা যে কোন পথে অদৃশ্য হয়েছে, সেটা টেরও পাইনি। তখন বসে বসে কপাল চাপড়াই। তাছাড়া গত বছরের আরেকটা সঙ্কল্পও এখনও টিকে আছে — খেলাধুলো আবার শুরু করা, শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা। এই শখটার সময়ের দাবী অনেক, আর এর লেজুড় হিসেবে আসে শারীরিক ক্লান্তি। এই দুই সঙ্কল্পরে দুই নৌকোয় পা দিয়ে চলতে গিয়ে আমার অবস্থা হয় লেজে গোবরে, আর ব্লগটারও বসে বসে মাছি তাড়ানো ছাড়া আর কোন কাজ থাকেনা বেশিরভাগ সময়। মনে মনে অবশ্য জানি যে এগুলো অজুহাত ছাড়া আর কিছু নয়, আর অজুহাত হিসেবেও খুব একটা মজবুত নয়। আরো অনেক ব্লগারকে চিনি, কাউকে প্রত্যক্ষভাবে, কাউকে বা ব্লগের মাধ্যমে। তাঁদের কারুরই লেখালেখিটা পেশা নয়, নেশা মাত্র। চাকরি বাকরি কাজ কর্ম সব সামলেই তাঁরা ব্লগ লেখেন। কিন্তু তাঁদের লেখা অনেক নিয়মিত, আর আমার মত ‘সময় পাচ্ছিনা’ বলে ডাক ছেড়ে কাঁদুনি গাইতে কাউকে দেখিনা। তবু মানুষের মন, ভাবের ঘরে চুরি করতে ভালবাসে। আমিও অজুহাতের পর অজুহাত খাড়া করি, নিজেকেই সান্তনা দিই।

আজ এই ব্লগের প্রথম জন্মদিন। ঠিক একবছর আগে আত্মপরিচয় দিয়ে ব্লগযাত্রা শুরু করেছিলাম।

তা এই একবছর ধরে (অনিয়মিত) লেখালেখি চালানোর অভিজ্ঞতাটা কেমন হল? এক কথায় বলা মুশকিল। একটা জিনিস স্বীকার করতেই হয় যে লেখাটা আগের তুলনায় অনেক স্বচ্ছন্দ হয়েছে। শুরুতে লিখতে গিয়ে বাংলা শব্দ হাতড়ে মরতে হত। ইংরিজি বেশি ব্যবহারের ফলে অনেক সময়ই ইংরিজি শব্দটা মাথায় আসত প্রথমে। বাংলা শব্দটাকে অনেক সাধ্য সাধনা করে স্মৃতির অতল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হত। বা যে জিনিসটা ছোটবেলায় কোনদিন ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি, সেই ইংরিজি থেকে বাংলা শব্দকোষের শরণাপন্ন হতে হত। অথচ তার পরে মনে হত যে এটা তো আমার অত্যন্ত পরিচিত শব্দ, একে ভুলে গেলাম কী করে? কালেক্রমে সে অবস্থাটার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন বেশিরভাগ সময়ই শব্দ খুঁজতে শিকার অভিযান চালাতে হয়না, আপনিই ধরা দেয় তারা। ভালো খারাপ যাই হোক, লেখার নিজস্ব একটা স্টাইলও তৈরী হয়েছে।

লেখা স্বচ্ছন্দ হওয়ার চেয়েও যেটার বেশি উন্নতি হয়েছে, সেটা হল চিন্তাধারা। একটা আইডিয়া বা মতামত মাথায় আসলে আগে সেটা হয়ত আধসেদ্ধ রয়ে যেত। লেখার প্রয়োজন না থাকলে চিন্তাটাকে একটা স্পষ্ট রূপ দেওয়ার তাড়া থাকেনা। কিন্তু লিখতে বসলে ছবিটা পাল্টে যায়। লিখতে হলে তলিয়ে না ভেবে, একটা স্পষ্ট বক্তব্য বা মতামত তৈরী না করে উপায় নেই। এমন নয় যে সব আইডিয়া নিয়েই লিখতে বসি। অনেকগুলোই পড়ে থাকে মনের গুদামঘরে। কিন্তু ‘কোন এক সময় লিখব’ এই ভেবে চিন্তাগুলোকে অল্প আঁচে রসিয়ে রসিয়ে কষাতে থাকি। হয়ত যেদিন সময় পাব, কুঁড়েমির কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ করবনা, সেদিন হয়ত এদের মধ্যে অনেকগুলোকেই ধুলো ঝেড়ে বার করে আনতে পারব।

তবে সব থেকে বড় প্রাপ্তি যেটা হয়েছে, সেটা হল কিছু ভক্ত পাঠক পাঠিকা লাভ। তাঁরা সংখ্যায় নগণ্য (ক’জনই বা এই ব্লগ পড়েন?), নিয়মিত না লিখে তাঁদের আমি হতাশ করেছি বারবার, কিন্তু তবু তাঁদের কাছ থেকে উৎসাহটা পেয়ে যাই নিয়মিত। কেউ লিখে জানান, কেউ বা মৌখিক। গত এক বছরে অনেকবার মনে হয়েছে যে আর কেন? এবার ক্ষান্ত দাও। কীই বা কাগের ঠ্যাং লিখবে আর কেই বা সে বচনামৃত পান করবে? কিন্তু তখনই মনে পড়ে ওঁদের কথা। এ সব মানসিক বাধা পেরিয়ে যে এক বছর পরেও ব্লগটা টিকে আছে, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার পাঠক পাঠিকাদের। তাই সেই পাঠক পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে এই পোস্টটা শেষ করি। আর নিজেই নিজের ব্লগকে আশীর্বাদ জানাই, — শতায়ু ভব!

Advertisements

4 thoughts on “জন্মদিন

  1. জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা জানাই ভেতোবাঙ্গালিকে। 🙂
    তোমার ব্লগটা আমার খুব পছন্দের, সেটা মনে হয় আর বলে দিতে হবেনা। তবে একটাই নালিশ তোমার বিরুদ্ধে, তুমি লেখো বড্ড কম। দ্বিতীয় জন্মদিনে লেখার সংখ্যা বাড়ুক, এই আশা করি। 🙂

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s