ক্ষণিকের অতিথি — ১

Pradipto Rayপ্রদীপ্ত রায়ের অনেকগুলো পরিচয়। ও শিল্পী, অ্যানিমেশন আর গ্র্যাফিক নভেল আর্টিস্ট। স্বনামধন্য ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ডিজাইন (NID), আহমেদাবাদের একজন আংশিক সময়ের অধ্যাপক। ও একজন স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র পরিচালক, যে অদূর ভবিষ্যতে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র পরিচালনা করার স্বপ্ন দেখে। শুধু স্বপ্ন নয়, রীতিমত পরিকল্পনা চলছে সে প্রোজেক্টের। মূলধারার হিন্দী সিনেমাতে ও অভিনয় করেছে, যেমন অনুরাগ কাশ্যপের Gangs of Wasseypur। সে সব ছাড়াও কিন্তু প্রদীপ্তর একটা পরিচয় আছে, যে পরিচয়ের কারণে ও আমাদের রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজের কাছে, এমনকী তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশের কাছেও, অনেক ক্ষেত্রে ব্রাত্য। ও একজন ট্রান্সজেন্ডার (transgender), বা বাংলায় রূপান্তরকামী। ওর ভাষায় বলতে হলে, ও ছেলের শরীরে আটকে পড়া একটি মেয়ে।

অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে প্রদীপ্ত

অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে।

প্রদীপ্তর সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ আলাপ হল সম্প্রতি। যোগাযোগ হল বেশ কাকতালীয় ভাবে। শ্রীমতী ভেতোবাঙালির অফিসে একটি বেশ বড় LGBT (Lesbian, gay, bisexual and transgender) সাপোর্ট গ্রুপ আছে। সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারদের উৎসাহ দেওয়া হয় তাঁদের পরিচয় সহজভাবে প্রকাশ্যে আনতে। সমকামীরা ছাড়াও আরো অনেকেই এই গ্রুপের সদস্য, যাঁদের মধ্যে শ্রীমতীও আছেন। প্রত্যেক বছর নভেম্বর মাসটাকে ’Pride month’ হিসেবে পালন করা হয়। আয়োজন করা হয় সেমিনার, সচেতনতা ক্যাম্পেন ইত্যাদি। বাইরে থেকে কয়েকজন ভিন্ন যৌনতার (alternate sexuality) মানুষকে — যাঁরা পেশাগত জীবনে কৃতি বা সমকামী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত — আমন্ত্রণ জানানো হয় এই উপলক্ষ্যে, প্যানেল ডিসকাশন ও সেমিনারের জন্য। এ বছরের প্রাইড মান্থের আয়োজক কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্যা ছিলেন শ্রীমতী ভেতোবাঙালি।

শ্রীমতী ভেতোবাঙালির সঙ্গে, বাড়িতে আড্ডা।

শ্রীমতী ভেতোবাঙালির সঙ্গে, বাড়িতে আড্ডা।

বাইরে থেকে কাকে ডাকা যায় এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল যে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোটামুটি নাম করা তথ্যচিত্র পরিচালক। থাকে মুম্বইতে। পরিচালনার কাজের দৌলতে গোটা দুনিয়ার লোকের সঙ্গে তার চেনাজানা। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল যে সে এরকম কাউকে চেনে কিনা। তার সূত্রেই প্রদীপ্তর সঙ্গে আলাপ এবং শেষ অবধি প্রদীপ্তর এই অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্যে ব্যাঙ্গালোর আগমন। ছিল একদিনই। সারাদিন শ্রীমতীর অফিসের অনুষ্ঠানের বক্তৃতা ইত্যাদি শেষ হওয়ার পর রাত্রিবেলা আমাদের বাড়িতে বসল একটা জমিয়ে আড্ডা — প্রদীপ্ত, শ্রীমতী আর আমি।

আমার অনেকদিন ধরে ইচ্ছা ছিল ওর একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে এই ব্লগে লেখার। ও রাজি হয়ে গেল তাতে। কিন্তু আমি আগে কখনো কারো সাক্ষাৎকার নিইনি। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দেখা গেল যে কথাবার্তার গতি প্রশ্নোত্তরের বাঁধা পথ ছেড়ে দিব্যি এদিক ওদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। পরিণত হচ্ছে নির্ভেজাল বাঙালি আড্ডায়। ভাগ্য ভাল যে সেই কথোপকথনের অনেকটাই আমি রেকর্ড করে রেখেছিলাম। তার থেকে কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি। লিখছি প্রশ্নোত্তরের ছাঁচেই, যতখানি সম্ভব। তবে প্রশ্ন আর উত্তরগুলো সবসময় যে একের পর এক এসেছে তা নয়। অনেক জায়গাতেই আড্ডার ছলে বলা কিছু কথাকে আমি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে চালিয়ে দিয়েছি। তবে প্রদীপ্ত নিজেও এটা রিভিউ করেছে, তাই ভুলচুক খুব একটা হয়নি আশা করছি।

আমিঃ তোমার ভাষায়, ট্রান্সজেন্ডার শব্দটার সঠিক সংজ্ঞা কী হবে?

প্রদীপ্তঃ অনেকে অনেক রকম সংজ্ঞা দিয়ে থাকে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হল এই যে ট্রান্সজেন্ডার হল এরকম একজন মানুষ যার শারীরিক ভাবে এক লিঙ্গ, কিন্তু মানসিক ভাবে (ইমোশনালি) নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের ভাবে বা হতে চায়। যেমন ধর কেউ পুরুষ হয়ে জন্মেছে, কিন্তু মনের দিক থেকে সে নিজেকে নারী হিসেবে গণ্য করে, নারী হতে চায়। ট্রান্সসেক্সুয়াল বলা যায় তাদের যারা সার্জারির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করেছে। ট্রান্সজেন্ডার হলেই যে ট্রান্সসেক্সুয়াল হতে হবে তা কিন্তু নয়। সার্জারি না করেও বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই করা যায়।

আমিঃ ছেলেদের মধ্যে ট্রান্সজেন্ডার আমরা দেখতে পাই, অনেক না হলেও কিছু কিছু। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে প্রায় দেখাই যায়না। অন্তত আমি তো দেখিনি। এর কারণ কী হতে পারে তোমার মতে? এটা কতখানি জৈবিক কারণ আর কতখানি সামাজিক কারণ?

প্রদীপ্তঃ দেখতে পাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু এতটা সহজ নয়। একটা ছেলে যখন ট্রান্সজেন্ডার হয়ে যায়, আমরা দেখি যে সে মেয়ে হয়ে যাচ্ছে — তার কথাবার্তা, চালচলন, বিশেষ করে পোষাকে। সেটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দশটা কেন, হাজারটা লোকের মধ্যেও তাকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায় — ওই ছেলেটা মেয়েদের পোষাক পরেছে। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে আজকের যুগে পোষাকটা আর দৃষ্টি আকর্ষণ করেনা। মেয়েরা তো শার্ট প্যান্ট টিশার্ট স্পোর্টস শু পরেই থাকে, ছোট করে চুল কেটেই থাকে। তার জন্য কেউ আলাদা করে তাদের দেখেনা, ট্রান্সজেন্ডার বা সমকামী মনে করেনা। তাই ভিড়ের মধ্যে তাদের আলাদা করে চিনে নেওয়াটা সহজ নয়।

অন্য দিক দিয়ে দেখ। ছেলেরা সামাজিক হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক, সাধারণত বেশি সাহসী হয়। এই যে আমি বলছি আমি একটা মেয়ে, কিন্তু সত্যি করে কি আমি মেয়ে হতে পারব? ছোটবেলা থেকেই আমি অনেক স্বাধীনতা পেয়ে এসেছি, যেটা হয়ত একটা মেয়ে পায়না। সমাজজীবনে মেয়েদের অনেকগুলো অলিখিত সীমারেখা থাকে। মেয়েটিকে তাই কিছু বলার আগে দশবার ভাবতে হচ্ছে, যেখানে আমাকে হয়ত একবারও ভাবতে হচ্ছেনা। রাত্রে বাড়িতে দেরী করে ফিরলাম? কিচ্ছু না, শুধু মা-বাবা একটু বকে দিল। একটি মেয়ে দেরী করে ফিরল? অসম্ভব! তাছাড়া, আমাদের সমাজে একটি মেয়ে একলা এমনিতেই নিরাপদ নয়। একলা মেয়ে, তা সে হোকনা চাকরি করা প্রফেশনাল উওম্যান, আমাদের সমাজ এখনো তাকে একটু অন্য নজরে দেখে। তার ওপর যদি সে প্রকাশ্য ভাবে বলে যে আমি আলাদা, আর পাঁচটা মেয়ের মত নই, আর সে কারণে যদি সে সমাজে কিছুটা একা হয়ে পড়ে, তার নিরাপত্তাটাও কিন্তু সেই একই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যে যখন ইচ্ছে যা ইচ্ছে করতে পারে! তাই হয়ত, আমার মনে হয়, মেয়েরা চট করে প্রকাশ্যে আসতে চায়না।

আমিঃ তোমার কেউ চেনা আছে, মেয়ে ট্রান্সজেন্ডার?

প্রদীপ্তঃ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আছে। আমার বন্ধু শ্রেয়া। কটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলি এই সূত্রে। শ্রেয়ার জন্ম রক্ষণশীল গুজরাতি পরিবারে। বাড়িতে নিষ্ঠার সঙ্গে কুলদেবতার পুজো হয়। মা রোজ সকালে দেড়ঘন্টা ধরে পুজো করেন। বাইরে থেকে ওঁদের দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবেনা যে আধুনিকতা বস্তুটির সঙ্গে ওঁদের কোনোরকম পরিচয় আছে। কিন্তু সেই মহিলাই যে আমাকে কতখানি ভালবাসতেন, ধারণা করতে পারবেনা। আমার একটি ছাত্র, NIDর, তার কনভোকেশনের সময় আমাকে বলল যে আমার বাড়ি থেকে কেউ আসতে পারছেনা। তুমি তো আমার মায়ের মত, তুমিই না হয় এস। আমি বললাম, বেশ, আসব। কিন্তু মা হয়েই আসব। কনভোকেশনের দিন আমি গেলাম আহমেদাবাদে শ্রেয়ার বাড়িতে, ওর মা’র কাছ থেকে একটা শাড়ি ধার করব। উনি বললেন, দেখ লে, কওনসা পসন্দ হ্যায়। তখন ওঁদের বাড়িতে পাশের ফ্ল্যাটের একটি মহিলাও ছিলেন। আমি ইচ্ছে করেই অনেক সময় নিয়ে সাজগোজ করলাম, যাতে শাড়ি পরে সেই পড়শি মহিলার সামনে বেরোতে না হয়। শ্রেয়ার মা’র অসুবিধে না থাকতে পারে, কারণ তাঁর মেয়েও ট্রান্সজেন্ডার। কিন্তু পড়শিও যে আমাকে সহজভাবে নেবেন এটা মনে করার কোন কারণ নেই — এই কিম্ভূত বিকট জীবটাকে দেখে আঁৎকে উঠতেই পারেন। যাই হোক, উনি চলে যাওয়ার পর আমি বেরোলাম। বাবা মা ছবি তুললেন, গল্পগাছা হাসিঠাট্টা হল। বেরিয়ে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছি, মা তখন সেই পড়শিকে ডাকলেন — দেখ কেমন সুন্দর আমার শাড়ি পরেছে। আঁৎকে ওঠা তো দূরের কথা, আমাকে দেখে উনি খুব খুশিই হলেন। দুজনের কেউই কিন্তু ইংরিজি শিক্ষিত লিবারেল সমাজের নন। বরঞ্চ তথাকথিত লিবারেল সমাজ ওঁদের রক্ষণশীল, হিন্দুত্ববাদী ইত্যাদি বলেই গণ্য করে। আমিও সেটাই ভেবেছিলাম, তাই ওনার সামনে বেরোইনি। একটা বড় ভুল ভেঙে গেল সেদিন।

NIDর কনভোকশনে তথাকথিত লেখাপড়া জানা মানুষ গিজগিজ করছিল। অনেক সহকর্মীই কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করে গেল যাতে শাড়ি পরা আমার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা না হয়, যে কোন ভাবে যাতে এড়িয়ে চলা যায়। এঁরাই কিন্তু সমাজের শিরোমণি। ইন্টেলেকচুয়াল, উদার মনস্ক, সব বিষয়ে মতামত রাখেন, লাল রঙের চশমা পরে পৃথিবী দেখেন।

আমিঃ তোমার নিজের জীবনের কথা বল। তুমি কীভাবে নিজেকে প্রথম প্রকাশ করেছিলে? তোমার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, ইত্যাদির প্রতিক্রিয়াই বা কী ছিল?

প্রদীপ্তঃ জীবনকাহিনী বলতে গেলে তো অনেক লম্বা হয়ে যাবে। কয়েকটা ছোট ছোট গল্প বলি বরঞ্চ। আমি অনেকগুলো স্কুলে পড়েছি। প্রথমে সেন্ট মেরীজ-এ ছিলাম, তারপর ওরিয়েন্ট ডে স্কুল বলে বেহালাতে একটা স্কুল আছে, সেটাতে। শেষে ক্যাথেড্রাল মিশন হাই স্কুল, যেটার পড়াশুনোর দিক থেকে মোটেই সুনাম ছিলনা। তারপর ওটা ছিল ক্রিশ্চান মিশনারি স্কুল, বয়েজ স্কুল। কিন্তু কী আশ্চর্য, এই স্কুলেই যে আমি কতখানি সাপোর্ট পেয়েছি সেটা প্রায় অবিশ্বাস্য। আমাদের ক্লাসে আরও তিনটি ছেলে ছিল ট্রান্সজেন্ডার (এটাও প্রায় অবিশ্বাস্য)। আমরা স্কুলে আসতাম আই শ্যাডো লাগিয়ে — নীল, সোনালি, হরেক রঙের। ভীষণ দৃষ্টিকটু — সত্তর আশির দশকে হিন্দী সিনেমার নায়িকাদের মত ক্যাটক্যাটে সব রঙচঙ। তখন কিছুটা মজা করার জন্য, কিছুটা বিদ্রোহ করার জন্য, এসব করতে ভালই লাগত। এখন ভাবলে মনে হয় কী সাঙ্ঘাতিক সব কান্ড করেছি। শিক্ষকরা দেখতেই পেতেন, আমরাও তো আর লুকিয়ে করতাম না এসব। কিন্তু কোনদিন কোন টিচার ওই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের কিছু বলেননি। বকাঝকা তো অনেক খেয়েছি, কিন্তু সাজগোজের জন্য নয়। বরঞ্চ অন্য ছেলেরাই আমাদের বুলি করতে ভয় পেত। ভাবত এরা নালিশ করলে তো স্কুল থেকেই তাড়িয়ে দেবে! টিচাররা আমাদের প্রায় চারদিক থেকে আগলে রেখেছিলেন। যেন বয়েজ স্কুলে চারটে মেয়ে পড়ে, তাদের অতিরিক্ত যত্ন করে রাখতে হবে।

স্কুল থেকে যখন বাইরে এক্সকার্শন ইত্যাদিতে যেতাম, আমাদের চারজনকে একটা আলাদা ঘর দেওয়া হত সবসময়। টিচাররা নজর রাখতেন ছেলেরা যেন ওদিকে না আসতে পারে বেশি। আমরা হয়ত মনে মনে চেয়েছি যে ছেলেরা আসুক। কিন্তু টিচাররা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার মনে হয়না পৃথিবীতে অন্য কোন স্কুলে আমি এরকম ভালবাসা বা সাপোর্ট পেতাম। ওই পাঁচ বছর যদি ওইরকম সাপোর্ট না পেতাম, তাহলে হয়ত আজ আমি এতটা আত্মপ্রত্যয়ীও হতাম না। বাড়িতে সাপোর্ট থাকলেও হয়ত না।

কদিন আগে আমাদের স্কুলের রিইউনিয়ন হল। আমাদের চারজনের একজন — সে এখন নাম পাল্টে রঞ্জিতা সিনহা, একজন অ্যাক্টিভিস্ট, কলকাতার টিভিতে ওকে প্রায়ই দেখা যায় — গেছিল স্কুলে। টিচাররা বললেন, এই! তুই তো এখন রঞ্জিতা! পুরোনো নাম কিন্তু আমরা লিখবনা। এক বাঙলার মাস্টারমশাই বললেন, বাবু আমার মামনি হয়ে গেছে, বা ওই জাতীয় কিছু একটা। খুবই হাস্যকর, হয়ত খুব একটা ভদ্র রুচিসম্মতও নয়। কিন্তু ওই মাস্টারমশাইদের এ ধরণের কথা বলার অধিকারটা ছিল, কারণ পুরো ছোটবেলাটা ওনারা আমাদের বাবা-মায়ের মত আগলে রেখেছিলেন। রঞ্জিতা নিজের ফেসবুকে ব্যাপারটা পোস্ট করেছিল। বলেছিল, আমার শিক্ষকরা আমার নতুন পরিচয়টাকে মেনে নিয়েছেন খুশিমনে। এটা আমার জীবনের সব থেকে আনন্দময় দিন।

আমিঃ তুমি মোটামুটি কত বছর বয়স থেকে বুঝতে পারলে যে তুমি আর পাঁচটা ছেলের চেয়ে আলাদা?

প্রদীপ্তঃ ঠিক কত বয়সে সেটা মনে নেই। ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকতাম, আর স্বাভাবিক ভাবেই বাঙালি বাড়িতে কেউ একটা আঁকলেই — তা সে যাই আঁকুক — সব আত্মীয়স্বজন বলে, ও কী ভাল আঁকে। তো সে যাই হোক, এই আঁকার সূত্রে দিদিদের যখন বিয়ে হত, তখন আমার ডাক পড়ত চন্দন পরানোর জন্য। আমার চন্দন পরানো দেখতে খুব ভাল লাগত, হাঁ করে বসে দেখতাম। তারপর যখন বিয়ের সময় বর আসত, ধুতির ওপর খালি গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে পিঁড়িতে বসত, তখন মনে হত যে আমাকেও তো একটা বয়সে এটাই করতে হবে। টোপর পরে, খালি গায়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই ভাল লাগতনা। আমিও ওই কাজটা করব ভাবলেই কেমন যেন একটা লাগত, একটা বিতৃষ্ণা আসত। খালি গা ব্যাপারটা আমার ছোটবেলা থেকেই পছন্দের ছিলনা। সেই আমি এরকম খালি গায়ে, কোনরকমে একটা চাদর জড়িয়ে — যে চাদরটা মাঝে মাঝেই সরে গিয়ে বুক পেট বেরিয়ে পড়ছে — লোকসমক্ষে বেরোব, এটা ভাবতে গিয়েই শিউরে উঠতাম। এরকম ভাবতে ভাবতে এক সময় মনে হয়েছে যে বরটা নয়, ওই বৌটাই আমি। কিন্তু সেটা যে কবে, আজ আর ঠিক মনে নেই।

একটা সময় এ নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছিল মনে। মনে হয়েছিল আমি এরকম কেন? আর তো কোন ছেলে বৌ হতে চায়না। আমিই কেন চাই? আমি কি একা, সবার থেকে আলাদা? তারপর যখন ওই স্কুলে গিয়ে চারজন এক হলাম, নিজেদের অভিজ্ঞতা বা চিন্তাগুলোকে মিলিয়ে নিতে পারলাম, তখন ভুল ভাঙল। বুঝলাম যে আমি একা নই! এটা হয়ত আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে।

(চলবে)

Advertisements

8 thoughts on “ক্ষণিকের অতিথি — ১

  1. খুব ভালো লাগছে পড়তে, তথাগত। ব্লগে তো চট করে সাক্ষাৎকার দেখা যায় না, তাই আপনাকে বাড়তি ধন্যবাদ জানালাম। সাক্ষাৎকারটি খুবই ইন্টারেস্টিং, বিশেষ করে ওই স্কুলে সাপোর্ট পাওয়ার ব্যাপারটা। আপনার লেখাও খুব সুন্দর হয়েছে, একদম মুখের কথাই শুনছি মনে হচ্ছে, কোথাও হোঁচট খেতে হচ্ছে না। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  2. খুব ডিটেল্ড কাজ। পড়ছি। তবে সামাজিক ট্যাবু শুধু ট্রান্সজেণ্ডারদের ক্ষেত্রেই নয়। পুরুষ এবং মহিলাদের খেত্রেও বেবাক আছে। ভালো লেখা। চলতে থাকুক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s