ভঙ্গদেশের রঙ্গকথা – ২

(আমার মেয়ের সঙ্গে একটি সত্যিকারের ‘বাবা, গল্প বল’ সেশন এই লেখাটার অনুপ্রেরণা। #Hokkolorob #হোককলরব এর প্রতি আমার আন্তরিক কিন্তু অক্ষম সমর্থন। প্রথম পর্বটা পাবেন এখানে।)

— বাবা, আজ কিন্তু পুরো গল্পটা বলতেই হবে। নইলে যেতে দেব না।

— হ্যাঁ রে, আজ পুরোটাই বলব। কাল কোন অবধি বলেছিলাম যেন?

— ওই যে, দিদি হয়ে গেল দেশের রাণী। কিন্তু তারপর কী হল? আর ওই ভিডিওর দিদিটাকেই বা মারছিল কেন পুলিশকাকুগুলো?

— হুঁ, মনে পড়েছে। ঠিক আছে, তারপর কী হল বল তো? দিদি তো হয়ে গেল রাণী। তাই দেখে সব্বাই কী খুশি! এতদিনে একজন মনের মত মানুষ সিংহাসনে বসেছে। সে আমাদেরই মত গরীব, কিন্তু ভয়ঙ্কর তার সাহস, আর তেমনই সৎ।

— সৎ মানে?

— সৎ মানে ভাল মানুষ — যে মিথ্যে কথা বলেনা, চুরি করেনা, কারুর ক্ষতি করেনা। তা সে রাণী সত্যিই গরীব ছিল, অন্তত লোকে তাই ভাবত। সাহসী তো সে ছিলই। আর কেউ তাকে কোনদিন চুরি চামারি করতেও দেখেনি। রাণী সিংহাসনে বসেই বলল, এতদিন যা হয়েছে তা হয়েছে, কিন্তু এবার আমি সব ঝেঁটিয়ে সাফ করব। আর কোন পেয়াদা গুমখুন করবেনা। কারুর বাড়িতে লেঠেল যাবেনা। সবাই ভালভাবে বাঁচতে পারবে।

— সত্যিই কি তাই হল?

— শোন না, বলছি। সে কথা শুনে তো লোকে ধন্য ধন্য করে উঠল। আর আগের রাজার আমলের যত পেয়াদা, লেঠেল ছিল তাদেরকে ধরে ধরে পেটাতে লাগল।

— কী মজা! দুষ্টু লোকের শাস্তি হল!

— অত তাড়াহুড়ো করিসনা। ব্যাপারটা অত সোজা নয়। পেটাতে গিয়ে দেখা গেল যে দেশের অাদ্ধেক লোকই সেই লেঠেলের দলে নাম লিখিয়েছিল। সবাইকে তো আর পেটানো যায়না। কয়েকজন পিটুনি খেল বটে, কিন্তু বাকিরা পিটুনির হাত থেকে বাঁচতে ভিড়ে গেল রাণীর দলে। একেবারে দলে দলে। রাতারাতি বেমালুম ভোল পালটে।

— কিন্তু বাবা, তাহলে কি দুষ্টু লোকগুলো শাস্তি পেলনা?

— না। কয়েকজন পেয়ে থাকলেও বেশিরভাগই পেলনা।

— তাহলে রাজা বদল হয়ে কী লাভ হল বাবা? রাণীই বা ওই লোকগুলোকে দলে ঢুকতে দিল কেন?

— আরে সেটাই তো গল্প। বাকিটা শোন। রাণী ঢুকতে দিল কেন? কারণ রাণী বুঝতে পারল যে মুখে যত ভাল ভাল কথাই বলনা কেন, রাজ্য চালাতে গেলে শুধু ভাল কথায় কাজ হয়না। রাজ্য চালাতে গেলে লেঠেলেরও দরকার পড়ে। তাই যখন লেঠেলেরা দলে দলে রাণীর দলে ভিড়ে পড়ল, রাণী চুপ করে মুখ বুজে রইল, যেন কিছুই জানেনা। রাণীর দলে যারা প্রথম থেকে ছিল, তাদের কয়েকজন এ নিয়ে একটু গাঁইগুঁই করল বটে। বলল, এ কী! আমরা এত কষ্ট করে যুদ্ধু করলাম, রাজ্য জয় করলাম, তখন তো এদের টিকির দেখা মেলেনি! এখন লাভের গুড় খাওয়ার জন্য এ ব্যাটারা উড়ে এসে জুড়ে বসে কেন? কিন্তু রাণীর এক দাবড়ানিতে আবার সব চুপচাপ হয়ে গেল। চলল সেই দল বদলের খেলা।

— তারপর কী হল?

— রাণী সিংহাসনে বসেই কয়েকটা কথা বুঝতে পারল। এক তো হল এই যে চটজলদি কিছু ভাল কাজ করে দেখাতে হবে, যাতে লোকের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আর দুনম্বর হল এই যে ঠুলিগুলো আবার মানুষের চোখে পরিয়ে দিতে হবে, আর এমন ব্যবস্থা করতে হবে যে কোনদিন সে ঠুলিগুলো যেন খসে না পড়তে পারে। যতদিন ঠুলি আছে ভাল, কেউ কোন প্রশ্ন করেনা। ঠুলি খুললেই মুশকিল, রাজ্যপাট হারাতে হতে পারে। আগের রাজার আমলের শেষে সেই ঠুলিগুলোই খুলে গেছিল। তাই যত ঝামেলা। এবার ঝামেলাটা গোড়াতেই মিটিয়ে ফেলতে হবে।

— কিন্তু বাবা, রাজা না হয় দুষ্টু ছিল, কিন্তু এই রাণীও কি খুব ভাল? আমার তো গল্প শুনে কেমন যেন লাগছে।

— ভাল কি মন্দ সেটা তুইই দেখ, আমি বলবনা। কিন্তু গল্পটা শুনে যা। এদিকে হয়েছে কী, রাজ্যের একদম ধারে কিছু জায়গায় কিছু খোক্কস এসে বাসা বেঁধেছিল। তারা সেখানকার গরীব লোকেদের ওপর খুব অত্যাচার করত। রাণী একদল পেয়াদা পাঠিয়ে সেই খোক্কসদের আচ্ছা করে পিটুনি লাগাল। আর সেখানকার গরীব লোকেদের জন্য স্কুল, হাসপাতাল এইসব তৈরি করে দিল। খোক্কসরা বাপ বাপ করে পালাল, সেখানকার লোকেরাও দুটো খেয়ে পরে বাঁচতে পারল। ব্যস, রাজ্যের লোক তো উৎসাহে একেবারে ধন্য ধন্য করে উঠল। রাজা যে কাজ তিরিশ বছরে পারেনি, রাণী সে কাজ কয়েক মাসের মধ্যে করে দিয়েছে! খোক্কস টোক্কস সব মেরে ঠান্ডা করে দিয়েছে। বাহবা, বাহবা!

— বাঃ!

— আর রাণী এমন সব আইন কানুন তৈরী করে দিল, যাতে কেউ আর খেলনা গাড়ির কারখানা বানাতে না পারে। শুধু খেলনা কেন, কোন কারখানাই যাতে কেউ বানাতে পারেনা। আর কারখানা না বানালে কারুর ধানজমিতেও হাত দেবার দরকার পড়বেনা। সেই পেটমোটাগুলো রাজার আমল শেষ হওয়ার পর একটু আশায় আশায় ঘুরঘুর করছিল, যদি এক আধটা ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারে। কিন্তু এবার তারা সত্যিই দেশ ছেড়ে পালাল।

— কী মজা!

— মজা বুঝি? কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখ তো, যদি কারখানা কুমোরশালা এসব না থাকে, তবে হাঁড়ি উনুন বানাবে কে? ধান কাটার কাস্তে বানাবে কে?

— তাই তো!

— কিন্তু বোকারা তো সে সব বোঝেনা, তারা রাণীর জয়জয়কার করে উঠল। রাণীর নাম দিল মুশকিল আসান রাণী। রাণীও আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠল।

— মুশকিল আসান মানে কী বাবা?

— মুশকিল আসান মানে যে সব প্রব্লেম সলভ করে দিতে পারে। এনি ওয়ে, আগে বললাম না, রাণী চেয়েছিল সবার চোখে পারমানেন্ট ঠুলি পরিয়ে রাখতে? এবার ও সেই কাজে হাত দিল। কী করল জানিস?

— কী করল?

— দেখ, মানুষের যদি বুদ্ধি থাকে তো সে চোখে ঠুলি পরে থাকেনা। সব কিছু দেখে বোঝার চেষ্টা করে, প্রশ্ন করে। তাই তো?

— হ্যাঁ।

— আর বুদ্ধি কী করে গজায় বল তো?

— কী করে?

— তুইই বল কী করে।

— অ্যাঁ, … , লে-লেখাপড়া করলে?

— কারেক্ট। যত লেখাপড়া করবে, তত বুদ্ধি খুলবে। যত বুদ্ধি খুলবে তত দেখতে, বুঝতে শিখবে, প্রশ্ন করতে শিখবে। আর যদি পড়াশুনো না করতে দাও, তাহলে মানুষ সারা জীবন বোকা হয়ে থাকবে, চোখে ঠুলি এঁটে থাকবে। কাজেই পড়াশুনো বন্ধ করে দিলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে।

— তা রাণী কি সব স্কুল বন্ধ করে দিল?

— শোন না। এই পড়াশুনো বন্ধ করার আইডিয়াটা কিন্তু নতুন নয়। আগের রাজাও এটা জানত। আর রাজার দলে তো অনেক বুদ্ধিমান লেখাপড়া জানা লোকও ছিল। রাজা করেছিল কী, তাদের সব টিচার বানিয়ে স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারা লেখাপড়া শেখাত যেমন তেমন, কিন্তু খুব মন দিয়ে শেখাত রাজাকে পুজো করার মন্ত্র। দিনরাত ওই মন্ত্রই জপ করতে শেখানো হত। মন্ত্র জপ করতে করতে সবাই ভেবে নিয়েছিল যে রাজা বুঝি একেবারে ভগবান। তাই তো চোখের ঠুলি খুলতে অত সময় লাগল।

— আর রাণী কী করল?

— রাণী একটু অন্য চাল চাললো। একে তো রাণীর দলে অত লেখাপড়া জানা লোক ছিলনা। তাছাড়া শুধু মন্ত্র শিখিয়ে যে বেশিদিন কাজ হয়না, এটা তো আগেই দেখা গেছে। তাই সে অন্য প্ল্যান বানালো। ভাবলো যে স্কুলগুলোকেই উঠিয়ে দেওয়া যাক।

— সব স্কুল বন্ধ করে দিল?

— না। কারণ হঠাৎ ওর মনে হল যে স্কুল বন্ধ করে দিলে লোকে ছিছি করতে পারে। তার চেয়ে ভাল যে স্কুল যেমন আছে থাক, কিন্তু সেখানে পড়াশুনোর পাট চুকিয়ে দেওয়া যাক। স্কুল খোলা থাকবে, ছেলেমেয়েরা সব আসবে, কিন্তু পড়াশুনো হবেনা। শুধু রাণীর ছবিতে একটা প্রণাম করে সব বাড়ি চলে যাবে আর খেলাধুলো করবে।

— স্কুলের টিচাররা কী করবে তাহলে?

— টিচারদের শায়েস্তা করার একটা খুব মোক্ষম উপায় বার করল রাণী। সবকটা স্কুলেই স্টুডেন্ট সাজিয়ে গুন্ডাদের পাঠিয়ে দিল। গুন্ডার তো অভাব ছিলনা। সেই যে লেঠেলগুলো রাণীর দলে ভিড়েছিল, রাণী তাদের জিজ্ঞেস করল, — কী রে, তোরা রোজ স্কুলে যেতে পারবি? পয়সা পাবি। তারা তো এক পায়ে খাড়া। পরদিনই সবকটা লেঠেল স্কুলের ইউনিফর্ম পরে সব স্কুলে স্কুলে হাজির। সকালবেলা টিচারগুলো এসে যেই ক্লাসে ঢুকতে যাবে, অমনি তারা সব হারেরেরে করে ছুটে এল। কী ব্যাপার? না, ক্লাস করা চলবেনা। ক্লাস করা বন্ধ। টিচারদের তো মাথায় হাত! কয়েকজন একটু বলতে গিয়েছিল যে, — দেখ বাবা, এটা স্কুল, এখানে একেবারে পড়াশুনো বন্ধ করে দেওয়াটা কি ভাল দেখায়? কিন্তু সে কথা শুনে লেঠেলগুলো তাদের এমন পিট্টি লাগাল, যে ভয়ে কারুর মুখে আর কথা সরছেনা। ব্যস, সব ঠান্ডা। সব পড়াশুনো বন্ধ। সবাই স্কুলে আসে যায়, টিচাররা মাইনে পায়, কিন্তু ক্লাস হয়না।

— এ কেমন দেশ বাবা?

— শিবঠাকুরের আপন দেশ। কিন্তু হয়েছে কী জানিস? সেই ভঙ্গদেশেও একটা স্কুল ছিল, খুব ভাল স্কুল, যেটাতে তখনো পড়াশুনো হত। ওই যে ভিডিওতে দিদিটাকে দেখলি, ও সেই স্কুলেই পড়ত।

— লেঠেলরা সেই স্কুলে ঢুকতে পারেনি বুঝি?

– না। ওই স্কুলে ঢুকতে হলে একটা পরীক্ষা দিতে হত। খুব শক্ত পরীক্ষা। মাথায় অনেক বুদ্ধি না থাকলে সেই পরীক্ষায় পাস করা যেতনা। তাই সব থেকে ভাল ছেলেমেয়েরাই ওই স্কুলে ঢুকতে পারত। লেঠেলগুলোর মাথায় আর বুদ্ধি কোথা থেকে আসবে? সব তো গোবর ভরা। তাই তারা পরীক্ষায় পাস করতে পারতনা। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায়না, নিয়ম কানুন নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়? অন্য সব স্কুলে তো নিয়মকানুন ভেঙেই লেঠেলরা ঢুকেছিল। কিন্তু হয়েছে কী, এই স্কুলের যে হেডমাস্টার, সে মহা ত্যাঁদোড় লোক। সে বলল, না! পরীক্ষা পাস না করে কেউ ঢুকতে পারবেনা।

— তারপর কী হল?

— হেডমাস্টারের কথা শুনে রাণী তো রেগে আগুন! কী? আমারই বাড়ির পাশে স্কুল, আর সেখানে বসে কিনা আমারই কথা অমান্যি করা? দেখাচ্ছি মজা! সে তখন হেডমাস্টারকে ফোন করে বলল, — ভালোয় ভালোয় আমার ছেলেগুলোকে ঢুকতে দিবি, নাকি তোকেও পিট্টি দিতে হবে? সে কথা শুনে হেডমাস্টার রেগে মেগে আর মনের দুঃখে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে গেল। কিন্তু স্কুল তো আর বিনা হেডমাস্টারে চলতে পারেনা, তাই নতুন হেডমাস্টার খুঁজতে হবে। রাণী দেখল যে এই সুযোগ। এই বারে আমার একটা চেলাকে হেডমাস্টার সাজিয়ে স্কুলে ঢুকিয়ে দিই। সে তখন লেঠেলদের ঢুকিয়ে বাকি মাস্টারগুলোকে শায়েস্তা করে দেবে। শুরু হল লোক খোঁজা।

— খুঁজে খুঁজে একটা দুষ্টু লোককে হেডমাস্টার বানালো বুঝি?

— তার চেয়েও মজার। বলেছিলাম না, রাণীর দলে লেখাপড়া জানা লোক তেমন কেউ ছিলনা? তাই চট করে হেডমাস্টারি করার মত লোক পাওয়া গেলনা। কিন্তু রাণী তাতে দমে যাবার পাত্রী নন। হয়েছে কী, রাণীর কতগুলো পোষা পাঁঠা ছিল। তার মধ্যে একটা পাঁঠার মনে খুব ইচ্ছে ছিল সায়েন্টিস্ট হবার।

— যাঃ! পাঁঠা আবার সায়েন্টিস্ট হয় নাকি?

— হয় নাইই তো। কিন্তু পাঁঠার মোটা মাথায় সে কথা কে ঢোকাবে বল তো? তাছাড়া, পাঁঠার বুদ্ধি থাকুক আর নাই থাকুক, জেদ ছিল ষোলআনা। সে জেদ ধরে থাকল, সায়েন্টিস্ট আমি হবই, যাই হোক আর তাই হোক।

— তাহলে? পাঁঠাটা কী করল?

— সায়েন্টিস্ট হবার জন্য তো লেখাপড়া করতে হয়। পাঁঠাটা গেছিল স্কুলে ভর্তি হতে। সব ভাল স্কুল থেকে ওকে দুদ্দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। শেষে একটা স্কুলের ক্লাসরুমের পাশে বসে বসে, দু-একটা অ-আ-ক-খ শিখে, এর-ওর খাতা থেকে দু’একটা পাতা চুরি করে নকল করে সে ভাবল, আমি মস্ত জ্ঞানী। তাই রাণী যখন তাকে জিজ্ঞেস করল, — কী রে? হেডমাস্টার হবি? — সে তখন উৎসাহের চোটে চারপা তুলে লাফিয়ে উঠল। পরদিন থেকেই সে স্কুলের হেডমাস্টারের চাকরিটা পেয়ে গেল। রোজ সকালে সে চশমা এঁটে স্কুলে যেত। গিয়ে নিজের অফিসঘরে বসে অন্যের খাতা দেখে দেখে হাতের লেখা প্র্যাকটিশ করত। তারপর সন্ধ্যেবেলা গুটি গুটি বাড়ি ফিরে যেত।

— কিন্তু বাবা, পাঁঠা হয়ে গেল হেডমাস্টার, আর কেউ কিছু বললনা?

— কে কী বলবে? যদি একটা দুষ্টু লোককে হেডমাস্টার বানাত তাহলে কেউ কেউ হয়ত আপত্তি করত। কিন্তু সে পাঁঠাটাকে দেখে সবাই এত অবাক হয়ে গেল যে মুখের হাঁ আর বন্ধই হয়না! সেই সুযোগে পাঁঠাটা গটগট করে ঢুকে পড়ল হেডমাস্টারের অফিসঘরে। আর সেই পাঁঠার হেডমাস্টার হবার সুযোগে একটা একটা করে লেঠেল স্কুলে এসে ঢুকতে থাকল। কয়েকটা লেঠেল করল কী, একটা দিদির সঙ্গে খুব দুষ্টুমি করল।

— কী দুষ্টুমি, বাবা?

— সেটা তুই এখন বুঝবিনা। কিন্তু দিদিটা খুব ব্যথা পেয়েছিল। ও কাঁদতে কাঁদতে হেডমাস্টারের কাছে গিয়ে বলল, তুমি ওই দুষ্টু লোকগুলোর শাস্তির ব্যবস্থা কর। পাঁঠা আর কী করবে? তাছাড়া ও তো জানে যে লেঠেলগুলো রাণীর দলের লোক। ওদের কিছু করা যায় নাকি? তাই ও চুপচাপ বসে রইল। কিন্তু এদিকে দিদিটাও ছিল একেবারে ত্যাঁদোড়। ও আর ওর কিছু বন্ধু সমানে হেডমাস্টারকে বলে যেতে লাগল, শাস্তি চাই শাস্তি চাই। পাঁঠার কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেল। ও ভাবল যে এবার তো কিছু একটা করতেই হবে, নইলে তো এ ব্যাটারা আমাকে জ্বালাতন করে মারবে। ও করল কী, ওরই মত আরো কয়েকটা পাঁঠাকে পুলিশের ড্রেস পরিয়ে স্কুলে নিয়ে এল আর বলল, তোরা এর তদন্ত কর! কিন্তু পাঁঠা আবার কী তদন্ত করবে? তার ওপর সবকটা তো রাণীরই পোষা পাঁঠা। তাই ওরাও কিচ্ছুটি করলনা। লেঠেলগুলো বহাল তবিয়তে ঘুরতে লাগল স্কুলের মধ্যেই।

— ঈশশশ!

— কিন্তু এবার হল কী, স্কুলে যত ছাত্রছাত্রী ছিল, তারা গেল খেপে। আমাদের স্কুলে এরকম দুষ্টুমি আগে কক্খনো হয়নি। যারা এটা করেছে তাদের কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া যায়না। তখন সবাই মিলে চলল হেডমাস্টারের অফিসে। কিন্তু ওরা যতই পাঁঠাকে বোঝাবার চেষ্টা করে, পাঁঠার মুখে কেবল একটাই বুলি, — ব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা! ওরা বলে, দুষ্টু লোকগুলোর শাস্তি চাই, পাঁঠা বলে ব্যা! ওরা বলে আমরা পাঁঠা পুলিশ চাইনা, পাঁঠা বলে ব্যা! সে এক অদ্ভূত ব্যাপার! শেষে ওরা দেখল এভাবে বলে লাভ নেই, পাঁঠা ওদের কোন কথাই শুনবেনা। পাঁঠাকে অন্য ভাবে শিক্ষা দিতে হবে। ওরা ঠিক করল যে পাঁঠাটাকে ওর অফিস ঘরেই আটকে রাখবে, বাড়ি যেতে দেবেনা। যেমন কথা তেমন কাজ। ছেলে মেয়ের দল তখন অফিসের সামনেই মাটিতে বসে পড়ল। কাউকে ঢুকতেও দেবেনা, কাউকে বেরোতেও দেবেনা। মাটিতে বসে ওরা গান ধরল, — পাঁঠা তুমি দুষ্টু লোক, তোমার দাড়িতে উকুন হোক!

— হি হি হি হি, উকুন! কী মজা!

— হ্যাঁ, দারুণ মজা! সেই গানের সঙ্গে কেউ বেহালা বাজাতে লাগল, কেউ বা বাঁশী বাজাতে লাগল। দেখে মনে হল যেন একটা উৎসব লেগেছে।

— কিন্তু পাঁঠাটা তখন কী করল বাবা?

— পাঁঠাটা কিছুক্ষন চুপটি করে বসে ছিল, ভেবেছিল যে স্টুডেন্টরা একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু বসে আছে তো বসেই আছে, স্টুডেন্টদের আর নড়বার নাম নেই। তার ওপর ও ব্যাটারা এমন বিশ্রী সুরে গান ধরেছে যে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়। আর গানের কী ভাষা! বলে কিনা আমার এমন সুন্দর দাড়ি, তাতে উকুন হোক? শেষে পাঁঠা ফোন করল রাণীকে। বলল, — রাণীমা! আমায় বাঁচান! এরা বলছে আমাকে দিয়ে মাংসের কালিয়া বানাবে!

— যাঃ! স্টুডেন্টদের কাছে কী মাংস কাটার বঁটি ছিল নাকি? আর রান্নার বাসন?

— তাই তো। কতগুলো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে, ওদের কাছে কি দা-বঁটি বা লাঠিসোঁটা থাকে নাকি? থাকার মধ্যে তো একটা বাঁশী আর একটা বেহালা। তার চেয়ে বড় কথা, ওরা কি কসাই নাকি যে মাংস কাটবে? তা সে কথা পাঁঠাও জানত, রাণীও জানত। কিন্তু তাতে কী এসে যায়? রাণী দেখল এই সুযোগ। এই সুযোগে সবকটা বজ্জাত স্টুডেন্টকে শিক্ষা দেওয়া যাবে। রাণী তখন পেয়াদাদের বলল, — যা। এক্খুনি স্কুলে যা। গিয়ে পাঁঠাটাকে অফিস থেকে বের করে আন। আর সেই বদের ধাড়ি ছাত্রগুলোকে আচ্ছা করে পিটুনি লাগা। একটাও যেন না বাঁচে। আমার সঙ্গে বজ্জাতি করার মজাটা টের পাওয়া চাই। তখন গভীর রাত। স্টুডেন্টরা তখনো ঠায় বসে আছে অফিসঘরের সামনে। পেয়াদার দল একেবারে হারেরেরেরে করে চড়াও হল স্কুলে। এসেই ধাঁইধপাধপ করে লাথি চড় কিল ঘুঁষি সব মারতে লাগল ছাত্রছাত্রীদের। মেয়েগুলোও বাদ পড়লনা। মার খেয়ে তো বাচ্চা ছেলেমেয়েরা একে একে পড়ে যেতে লাগল। তখন পেয়াদারা তাদের ঠ্যাং ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গেল। সবকটা আলো নিভিয়ে দিল পেয়াদার দল, যাতে কেউ কিছু দেখতে না পায়, কোন ছবি তুলতে না পারে, ভিডিও তুলতে না পারে।

— কী সাঙ্ঘাতিক!

— একটা দিদি বলল আমি কিছুতেই পেয়াদাদের অফিসঘরে ঢুকতে দেবনা। সে অফিসের গেট আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইল প্রাণপণ। কিন্তু দুটো পেয়াদা এসে ওকে মারতে মারতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল। সেটারই ভিডিও তুই দেখছিলি কাল। আলো নেভানোর আগেই ওটা কেউ তুলেছিল।

— কিন্তু বাবা, এটা তো গল্প, আর ভিডিওটাতো সত্যি। কেমন করে?

— ধরে নে এটা গল্প হলেও সত্যি। বা সত্যি হলেও গল্পের মত।

— মানে?

— মানে কিছু একটা ধরে নে না। এদিকে কী হল শোন। পেয়াদাগুলো পাঁঠাটাকে অফিস থেকে বের করে আনল, পাঠিয়ে দিল বাড়ি। আর ছাত্রদের মধ্যে যে ক’জন তখনো মার খেয়েও দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের টেনে নিয়ে গিয়ে ভরে দিল জেলে।

— তারপর?

— রাণী ভাবল ল্যাঠা চুকে গেল। আমার পাঁঠাটাও আস্ত রইল, আর বজ্জাতগুলোও শিক্ষা পেল। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। পরদিন সকালে যখন খবর রটে গেল যে পেয়াদারা ছাত্রদের পিটিয়েছে, সারা রাজ্যে যত ছাত্রছাত্রী ছিল, সব রেগে আগুন হয়ে গেল। শুধু ছাত্ররা কেন, বুড়োরাও, যারা এতদিন চোখে ঠুলি এঁটে বসে ছিল, তারাও নড়ে চড়ে বসল। এক ধাক্কায় সবার চোখের ঠুলি খুলে গেছে কিনা।

— তারপর? তারপর? আবার যুদ্ধ হল বুঝি?

— না। এখনো নয়, তবে তার তোড়জোড় চলছে। তবে সারা রাজ্যে যত ছেলেমেয়ে ছিল, সবাই বলে উঠেছে, এটা অন্যায়! এ চলবেনা। সেই গর্জন মিনিটে মিনিটে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। সবাই বলছে, এর বিহিত চাই। সবাই বলছে, এর প্রতিবাদ চাই। হোক প্রতিবাদ! হোক কলরব! রাণীকে আমরা ভাল ভেবেছিলাম, কিন্তু এ তো ঠিক আগের রাজার মতই। সবাই তখন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠছে, — দড়ি ধরে মারো টান। রাণী হবে খান খান।

— কী মজা! ঠিক হীরক রাজার মত। কিন্তু বাবা, এই দেশে কি গুপী বাঘা আসবে?

— আসতেও পারে। তবে না আসলেও ক্ষতি নেই। দেশের মানুষ যখন একবার রেগে যায়, তখন যত বড় রাজাই হোক না কেন, তার আর নিস্তার নেই। তাকে সিংহাসন থেকে টেনে নামিয়েই ছাড়বে লোকে। এখন লোকে রাগতে শুরু করেছে সবে। যুদ্ধ হবে পরে।

— কিন্তু বাবা, একটা কথা বল। এক রাজাকে তাড়িয়ে এল আরেক রাজা। তাকে তাড়িয়ে এল রাণী। কিন্তু বারবার এমন হয় কেন? লোকে রেগে যায় কেন?

— বাঃ! দারুণ প্রশ্ন করেছিস তো! ভেরি গুড। তবে বলি শোন। দেশের আসল রাজা কিন্তু যে সিংহাসনে বসে সে নয়। আসল রাজা হল দেশের মানুষ। যারা চাষ করে, নদীতে মাছ ধরে, স্কুলে পড়ায়, সবাই আসলে রাজা। যে সিংহাসনে বসে, তার কাজ ওই সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করা। কিন্তু সিংহাসনে বসেই রাজা বা রাণী যেই হোক, তার মুন্ডু ঘুরে যায়। সে তখন দেশটাকে নিজের জমিদারি ভাবতে শুরু করে। আর বেশিরভাগ মানুষের চোখেই তো ঠুলি আঁটা থাকে। তারা রাজা বা রাণীর ফন্দিফিকির বুঝতে পারেনা। সেই সুযোগে রাজা অত্যাচার করে।

— তাহলে? একই গল্প কী চলতেই থাকবে।

— হয়ত কিছুদিন চলবে। তবে একদিন না একদিন মানুষের মাথায় সত্যিকারের বুদ্ধি হবে, চোখে আর ঠুলি পরবেনা। সেদিন রাজা-রাণীদের যত জারিজুরি সব ফাঁস হয়ে যাবে। তখন দেখবি, সব ভালমানুষের মত রাজ্য চালাবে। দেশের মানুষও সুখে খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। সে জন্য কিন্তু পড়াশুনো করতে হবে সবাইকে। পড়াশুনো করলেই মানুষ হবে। না করলে সারা জীবন বোকা হয়েই থাকতে হবে। তোর হোমওয়ার্ক শেষ হয়েছে?

— হ্যাঁ বাবা।

— গুড গার্ল। এবার চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড় তো লক্ষ্মীটি! গুড নাইট। সুউট ড্রিমস।

— গুড নাইট বাবা।

Advertisements

5 thoughts on “ভঙ্গদেশের রঙ্গকথা – ২

  1. তবে একদিন না একদিন মানুষের মাথায় সত্যিকারের বুদ্ধি হবে, চোখে আর ঠুলি পরবেনা

    তদ্দিন মনে হয়না বেঁচে থাকবো 😥

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s