মোটরবাইকে লাদাখ ভ্রমণ প্রস্তুতি – কিছু জ্ঞানগর্ভ উপদেশ

এটা গুরুচন্ডা৯-তে লেখা একটা টই থেকে কপি-পেস্ট করা। আলোচনা প্রশ্নোত্তর পর্বগুলো বাদ দিয়েছি। শুধু আমার জ্ঞানদানটাই তুলে ধরলাম এখানে। টেকনিকাল কচকচিতে ভর্তি, তাই নেহাৎ মোটরবাইকে লাদাখ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান না থাকলে এটা পড়ার প্রয়োজন নেই। টই-তে হারিয়ে যাবে বলে এখানে তুলে রেখে অমরত্ব প্রদান করলাম। 🙂

***

প্রথমেই একটা ছোট্ট ভূমিকা লিখে নেওয়াটা জরুরি। পোস্টের টাইটেল দেখে নির্ঘাৎ পাবলিক চমকে চব্বিশ হয়ে গেছে। আনকোরা নতুন লেখক, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে লাদাখ নিয়ে লেখা শুরু করল কেন? তাও লাদাখ ভ্রমণ নয়, ভ্রমণের প্রস্তুতি? যেখানে আর সব লেখালেখি চলছে সিরিয়াস ব্যাপার স্যাপার নিয়ে? এসব সঙ্গত প্রশ্নের উত্তর হিসেবেই ভূমিকাটা প্রয়োজন।

বিশদেই বলি। বছর চারেক আগে আমি মোটরবাইকে লাদাখ ঘুরতে যাই। ভাল মন্দ মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা সাঙ্ঘাতিক হয়েছিল। আমার নিজস্ব একটা ব্লগ আছে, এ বছরের গোড়ায় শুরু করেছি। তাতে এই লাদাখ ভ্রমণের গল্প বেশ ফলিয়ে লিখেছিলাম। গুরুচন্ডা৯র নিয়মিত সদস্য অচল সিকি সেটা পড়ে ব্যাপক থ্রিলড হয়ে যান আর প্রচুর প্রশংসা করেন। সত্যি কথা বলতে গেলে, সে গল্পটা শেষ অবধি লিখতে পেরেছিলাম সিকির দেওয়া উৎসাহের দৌলতেই। তাঁরই অনুরোধ ছিল যে আমি গুরুচন্ডা৯তে একটা সুতো খুলে লাদাখ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কিছু লিখি। অতঃপর এই পোস্ট। তা সে সময়ের অভাবে এবং গড়িমসি করতে করতে এই এতদিনে হাত দিলাম। লেখা ভাল লাগলে প্রশংসা আর খারাপ লাগলে গালাগালি দুটোই একশো শতাংশ সিকির প্রাপ্য। 🙂

আমি লাদাখ মোটরবাইকেও ঘুরেছি, আবার তার পরের বছর প্লেনে করে গিয়ে গাড়িতেও ঘুরেছি। গাড়ি করে ঘুরতে হলে কিছু ভাল গরম জামাকাপড় সঙ্গে নেওয়া, আর আগে থেকে কয়েকটা মাউন্টেন সিকনেসের ওষুধ খেয়ে নেওয়া ছাড়া আলাদা করে কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মোটরবাইকের কথা আলাদা। পূর্ব অভিজ্ঞতা যদি না থাকে, ভালরকম যোগাড়যন্ত্র না করে গেলে মহাপুরুষদের না হলেও, আমাদের মত সাধারণ মানুষের বিস্তর ভোগান্তির সম্ভাবনা।

লাদাখ শব্দটার অর্থ হল গিরিবর্ত্মের (mountain pass) দেশ। এরকম সার্থকনামা দেশ দুনিয়ায় দুটি আছে কিনা জানিনা। লাদাখের প্রধান শহর লেহ তে পৌঁছবার দুটো রাস্তা আছে — একটা শ্রীনগর থেকে আর দ্বিতীয়টা মানালি থেকে। কিন্তু যে পথেই আপনি পৌঁছতে চান, বেশ কয়েকটা ষোলো-সতেরো হাজার ফুটিয়া পাস না পেরিয়ে গতি নেই। শুধু তাই নয়, লাদাখের মধ্যে কোথাও বেড়াতে গেলেও — যেমন প্যাঙ্গং হ্রদ বা নুব্রা উপত্যকা — সেই দানবাকৃতি পাহাড় পেরোতে হবে। অধিকাংশ জায়গায় রাস্তার বিশেষ কোন অস্তিত্ব নেই। পাথুরে জমির ওপর দিয়েই চলতে হবে। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হল যে অনেক জায়গায় নদী বা ঝর্ণা রাস্তার ওপর দিয়েই বয়ে যায়। দুচাকায় করে সেগুলো পেরোন বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এইসব কারণেই মোটরবাইকে লাদাখ যেতে হলে, অন্তত প্রথমবার, ভালরকম প্রস্তুতি করে যাওয়াই উচিত।

মোটরবাইক দিয়েই আলোচনাটা শুরু করি। প্রথম প্রশ্ন হল যে কোন মোটরবাইক। নিজের মোটরবাইক নিয়ে যেতে হলে এ প্রশ্নটা অবান্তর। তবে ভাড়ার বাইক নিতে হলে এটা জরুরি প্রশ্ন। আমি নিজে রয়্যাল এনফিল্ড বুলেট চালাই, তাই বুলেটের প্রতি আমার অগাধ পক্ষপাতিত্ব। কিন্তু পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তি দিয়ে বিচার করলে বুলেট প্রথম পছন্দ নাও হতে পারে। লাদাখের রাস্তায় খুব বেশি খাড়াই কোথাও নেই, কারণ ওই রাস্তায় ভারি ভারি লরি চলে। বেশি খাড়াই হলে লরি উঠতেই পারবেনা। আর যে রাস্তায় লরি উঠতে পারে, সেখানে বাইক (তা সে যে কোন বাইকই হোক না কেন) অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। অসুবিধাটা হয় ১৬-১৭ হাজার ফুটের ওপর অক্সিজেনের অভাবে। কম অক্সিজেনে পেট্রল ঠিক করে পোড়েনা, তার ফলে বাইক চলতে চায়না, ভুটভাট করে আপত্তি জানায়। এই ক্ষেত্রে বুলেটের কোন জুড়ি নেই, অন্তত একশো-দেড়শো সিসির বাইকগুলোর তুলনায়। বড় ইঞ্জিন হওয়ার দরুণ টিউনিং ঠিকঠাক থাকলে বুলেট অক্লেশে সবথেকে উঁচু পাসগুলোও পার করে দেবে। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও দেখেছি — রাস্তায় অনেক বুলেট আটকে যেতে দেখেছি, অনেকের বাইক ঠেলতে সাহায্য করেছি। তবে সেটার কারণ ঠিকঠাক টিউনিং না করা আর বাইক সম্বন্ধে কারিগরি জ্ঞানের অভাব। ঐ দুটি জিনিসের ভাঁড়ারে টান না পড়লে, মা ভৈঃ!

বুলেটের আরেকটা গুণ হল যে রাইডিং পোজিশন অত্যন্ত আরামদায়ক। বহুক্ষণ চালিয়ে নেওয়া যায় কোমর আর পিঠের দফারফা না করে। আমি নিজে তেরো ঘন্টা লাদাখের রাস্তায় বাইক চালানোর পরও দুপায়ের ওপর খাড়া ছিলাম, আর ভগবান জানেন যে আমার শারীরিক ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে বেশি নয় মোটেই। অন্যদিকে একশো-দেড়শো সিসির বাইকগুলো প্রায় কোনটাই খুব লম্বা সফরের উপযোগী নয়, কারণ তাদের সিটিং পোজিশনটা বেশ উঁচু। ব্যতিক্রম পুরোন ইয়ামাহা আর এক্স ১০০ ও ১৩৫, বা নতুন বাজাজ অ্যাভেঞ্জার। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হল নিচু সীট আর উঁচু হ্যান্ডেলবার। নতুন বহু ভাল বাইক আছে — নতুন ইয়ামাহা বাইকগুলো, যেমন এফ এক্স, বা হন্ডা সিবিআর, বা বাজাজ পালসার, বা কেটিএম ডিউক। ইঞ্জিনও অত্যন্ত শক্তিশালী, এবং উন্নত কারিগরীর জন্য মাঝরাস্তায় গণেশ উল্টোনর সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। মুশকিল হল এই যে এগুলো সব রেসিং বাইক জাতীয় ডিজাইন, ফলতঃ সামনের দিকে ঝুঁকে হাতের ওপর ভর দিয়ে চালাতে হয়। এসব বাইক নেওয়ার আগে যাচাই করে নেবেন যে অকহতব্য খারাপ রাস্তায় নিজের পিঠের ও কাঁধের সাড়ে তেরোটা না বাজিয়ে আপনি বারো-তেরো ঘন্টা নাগাড়ে বাইক চালাতে পারবেন কিনা। পারলে কোন অসুবিধে নেই, তবে পাড়ি দেওয়ার আগে নিজের ক্ষমতাটা যাচাই করে নেওয়া ভাল।

বুলেট নেওয়ার প্রধান সমস্যা হল নির্ভরযোগ্যতার অভাব। একটু পুরোন মডেলের বুলেট হলে যে কখন তেল ছড়াতে শুরু করবে, বা কখন ক্লাচ কেবল ছিঁড়বে, সে ওপরওয়ালাই জানেন। পোড়খাওয়া বুলেটবিলাসীদের কাছে এগুলোই আনন্দ, এসব না হলে তেনাদের মন ওঠেনা। তাঁদের বিলাস নিয়ে তাঁরা থাকুন, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে বরফের ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ক্লাচ কেবল বদল করার অনুভূতিটা খুব সুখের হবেনা। আর স্টার্ট করার ঝামেলা তো আছেই। ইলেক্ট্রিক স্টার্টার না থাকলে পদে পদে ভোগান্তির সম্ভাবনা। আমার লাদাখ সফরের সঙ্গী জয় যে কত ভুগেছে এ রোগে, সে আমিই জানি। আশার কথা, নতুন যে বুলেট মডেলগুলো বাজারে এসেছে, তাতে এই কারিগরী ত্রুটিগুলো বহুলাংশেই সমাধান করা হয়েছে বলে শুনেছি। ইলেক্ট্রিক স্টার্ট বোতামটাও শুনেছি আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।

শেষমেশ এটাই বলে রাখি, যে মডেলের বাইকই নিন, বাইকের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সাবধান থাকবেন। সম্ভব হলে সবকটা কেবল (তার) নতুন লাগান। সামর্থ্যে কুলোলে এক জোড়া নতুন টায়ার টিউবও লাগিয়ে নিন — সাবধানের মার নেই। ইঞ্জিন অয়েল, গিয়ার বক্সের অয়েল, ডিস্ক ব্রেক থাকলে ব্রেক অয়েল তো অতি অবশ্যই পাল্টে নেবেন। ইঞ্জিন যেন মাখনের মত চলে, একটুও যেন বেসুরো না বাজে। কার্বুরেটর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরিষ্কার করাবেন।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলঃ নিজের মোটরবাইক নিয়ে যাবেন, নাকি ভাড়া নেবেন? যদি ভাড়া নিতে হয়, তাহলে কোথা থেকে নেবেন? এটা অত্যন্ত জটিল প্রশ্ন আর এর কোন সঠিক উত্তর নেই। বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন উত্তর পাবেন।

যাঁরা উত্তর ভারতে, বিশেষতঃ দিল্লী বা তার আশেপাশে থাকেন, তাঁদের পক্ষে নিজের বাইক নেওয়াটাই ভাল। অবশ্য যদি সে বাইকের লাদাখ টানার ক্ষমতা থাকে তবেই (ওপরের অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)। দিল্লী থেকে বাইক চালিয়েই মানালি বা শ্রীনগর চলে যাওয়া যায়। বাইকটাকে ট্রেনে বা ট্রাকে তোলার ঝামেলা পোয়াতে হয়না। কিন্তু যাঁরা দুর্ভাগ্যক্রমে হিমালয় পর্বত থেকে কিছুটা দূরে থাকেন, তাঁদের পক্ষে নিজের বাইকে যেতে হলে, বাইকটাকে ট্রেনে তোলা ছাড়া গতি নেই। ট্রাকে ভুলেও তুলবেননা, কারণ ট্রাক যে কখন দিল্লী বা জম্মু বা চন্ডীগড় পৌঁছবে, তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। ভারতবর্ষে কোন ট্রানসপোর্ট কম্পানি সময়ানুবর্তিতার জন্য বিখ্যাত নয়। শেষে হয়ত দেখবেন যে আপনি দিল্লী পৌঁছে আঙুল চুষছেন আর ট্রাক তখনো মাঝ রাস্তায়। এ ছাড়া বাইকের ড্যামেজ হওয়ার সম্ভাবনা তো আছেই। সে সম্ভাবনা অবশ্য ট্রেনে গেলেও আছে। তবে সেখানে অন্তত বাইক আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। একটা কথা বলে রাখি, ট্রেনে তোলবার সময় কিন্তু বাইকের ট্যাঙ্ক খালি করে দিতে হয়। এক ফোঁটা তেল থাকলেও ট্রেনে তুলতে দেয়না। তাই সঙ্গে একটা বড় ক্যানেস্তারা নেবেন, যাতে ট্যাঙ্কের তেলটা ভরে রাখা যায়। আবার দিল্লী স্টেশনে নেমে ট্যাঙ্কে ভরতে হবে তো!বাইক ট্রেনের ব্রেকভ্যানে তুলতেও কিছু কিছু ঝক্কি পোয়াতে হয় শুনেছি। রেল কর্মচারীরা হাত বাড়িয়েই থাকে। কাজেই সেখানে পকেট কিছুটা হাল্কা করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন।

আমি নিজের বাইক নিয়ে যাইনি, সময় বাঁচাবার জন্য। অনেক আগে টিকিট কাটায় প্লেনের টিকিট পেয়েছিলাম বেশ শস্তায়। তাই ব্যাঙ্গালোর থেকে দিল্লী ট্রেনে করে যাতায়াতের অতিরিক্ত পাঁচ-ছটা দিন আর নষ্ট করতে মন চায়নি।

ভাড়ার বাইক দিল্লীতে পাওয়া যায়, মানালিতেও পাওয়া যায়। জম্মুতেও পাওয়া যায় হয়ত, ঠিক জানিনা। স্বাভাবিক ভাবেই দিল্লীতে চয়েস বেশি। মানালিতে খুব বেশি গ্যারাজ নেই। আমি ইচ্ছে করেই এখানে কোন গ্যারাজের নামোল্লেখ করছিনা, আন্তর্জালে একটু খোঁজাখুঁজি করলেই পেয়ে যাবেন। ভাড়ার বাইক নেওয়ার সুবিধে এই যে যাতায়াতের সময় নষ্ট হয়না। তাছাড়া বিপদে পড়লে সে বাইক ফেলে পালাতে হলে মনে চোট লাগলেও পকেটের ওপর চোটটা (অন্তত নিজের বাইক ফেলে পালানোর চেয়ে) কম লাগবে। সুবিধার তুলনায় কিন্তু অসুবিধার ফিরিস্তিটা অনেক লম্বা, আর আমি নিজে ঘোরার সময় প্রায় এর সবকটা ঝামেলারই মুখোমুখি হয়েছি।

প্রথম অসুবিধেটা আর্থিক। বাইকভাড়া এমনিতেই কম নয়, তার ওপর আবার লাদাখ যাব জানলে এক লাফে ভাড়া বেড়ে যায় দেড়গুণ। এখন দিল্লী বা মানালিতে কত ভাড়া হয়েছে জানিনা, তবে আমি যখন গেছি, তখন দৈনিক ভাড়া এক থেকে দু হাজারের মধ্যে ঘোরা ফেরা করছিল। এখন নির্ঘাৎ ওর চেয়ে অনেক বেশি। তাই পকেট সামলে।

দ্বিতীয় অসুবিধে, বাইক পাওয়া যাবে কিনা তার কোন গ্যারান্টি নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। আমরা খুঁজেপেতে মানালির একটা গ্যারাজে আগে থেকে ফোন করে বাইক বুক করেছিলাম। টাকাও পাঠানো হয়েছিল আগাম। কিন্তু মানালি পৌঁছে শুনি যে বাইক নেই। এর আগের দল টুরিস্টের সঙ্গেই আছে সে বাইক। কাজেই বাইক বুক করার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত দোকানওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন, যাতে ওখানে পৌঁছে আর এরকম বেআক্কেল ব্যাপারের সম্মুখীন না হতে হয়।

তৃতীয় অসুবিধে, বাইকের গুণগত মান অনিশ্চিত। নতুন বা প্রায় নতুন বাইক অনেক আছে বটে, কিন্তু কপাল মন্দ থাকলে (যেমন আমাদের ছিল) সে বাইক আপনি পাবেননা। পাবেন মান্ধাতা আমলের কোন বুলেট। সে নিয়ে লাদাখ জয় করতে হলে ভাগ্য জিনিসটা সহায় হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কাজেই বাইকের মডেলটাও আগে থেকে ফোন করে ঠিকঠাক করে রাখাটাই ভাল। এখানেও ওপরের অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য। বাইকওয়ালার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা নিতান্তই প্রয়োজন।

শেষ অসুবিধে, মানুষ নিজের বাইকের ঘাঁৎ ঘোঁৎ জানে। ইঞ্জিন একটু বেগড়বাঁই করলে বা একটু বেসুরো বেতালা বাজলেই সেটা কানে লাগে। ভাড়ার বাইকের সঙ্গে তো আর সে পরিচিতি নেই। তার ইঞ্জিনের ফটফট কোনটা যে সুস্থতার লক্ষণ আর কোনটা যে নাভিশ্বাস ওঠার শব্দ, সেটা গোড়ায় বুঝতে না পারাটা বিচিত্র নয়। বুঝতে বুঝতে হয়ত দেখবেন যে যা গোলমাল হওয়ার তা হয়ে গেছে। অতএব সাবধান। বাইক হাতে পেয়ে, সরাসরি সেটাকে নিয়ে রোহতাং-এর রাস্তা পাড়ি দেবেননা (আমরা যে মোক্ষম বোকামিটা করেছিলাম)। অন্তত একদিন মানালির আশেপাশে চালিয়ে দেখুন।

একটা কথা বলে রাখি — নিজের বাইকই হোক বা ভাড়ার বাইক, লাদাখের মূল রাস্তায় ওঠার আগে কোন ভাল মেকানিককে দিয়ে (বা যদি নিজের পর্যাপ্ত কারিগরী জ্ঞান থাকে তো নিজেই) বাইকের টিউনিংটা, বিশেষত কার্বুরেটর টিউনিং, করিয়ে নেবেন। মানালি দিয়ে গেলে মানালিতে করাবেন, শ্রীনগর দিয়ে গেলে শ্রীনগরে। যে টিউনিং-এ সমতল রাস্তায় বাইক ভাল চলবে, সে একই টিউনিং-এ কিন্তু উঁচু পাহাড়ে চালাতে গেলে ঝামেলায় পড়বেন (আমি নিজে পাকামি করতে গিয়ে এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি)। উল্টোটাও সত্যি। পাহাড়ের টিউনিং নিয়ে সমতলে চালাতে গেলে বাইক রাক্ষসের মত তেল খাবে।

(আজ এই অবধিই। অতি শীঘ্রই আবার এক বস্তা জ্ঞান নিয়ে হাজির হব)

***

ফিরে এলাম জ্ঞানদানের দ্বিতীয় কিস্তি নিয়ে। এবারের পর্ব বাইকের প্রস্তুতি। এর আগেই বলেছি যে মোটরবাইকটাকে একেবারে নতুনের মতো সার্ভিস করিয়ে নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। এ কথাটার গুরুত্ব বারবার করে বললেও কম হয়। কিন্তু শুধু সার্ভিস করানো ছাড়াও দু’একটা জিনিস করতে হয়।

বাইকের যন্ত্রপাতি (মানে টুলবক্স) সঙ্গে নেবেন এটা বলাই বাহুল্য। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি। বাইকের সঙ্গে যে টুলবক্স আসে তাতে অনেক সময় সব প্রয়োজনীয় মাপের স্প্যানার বা অ্যালেন কি (allen key বা hex spanner) থাকেনা। কেন থাকেনা সেটা খোদায় মালুম, তবে মাঝরাস্তায় বাইকের কেবল্ বদলাতে বসে যদি দেখেন যেটা প্রয়োজন সেই স্প্যানার হাজার হাতড়েও খুঁজে পাচ্ছেননা, তখন নিজের পশ্চাদ্দেশে পদাঘাত করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবেনা। এই পরিস্থিতিতে আমি নিজেই একবার পড়েছি, যদিও সৌভাগ্যক্রমে লাদাখের রাস্তায় নয়। তাই ভাল হচ্ছে সব সাইজের স্প্যানারের আর অ্যালেন কি’র একটা সেট কিনে রেখে দেওয়া। বাকি যন্ত্রপাতি টুলবক্সে যা থাকে তাই মোটামুটি যথেষ্ট। এছাড়া নেবেন পাংকচার সারাইয়ের সরঞ্জাম, মানে আঠা, রবারের টুকরো ইত্যাদি। বাইকের কাজ আর কিছু শিখুন না শিখুন, চাকা খুলে টিউব বার করে পাংকচার সারাতে অতি অবশ্যই শিখবেন। বাইকের আইডলিং স্পীডটা কমাতে বাড়াতে শেখাটাও অত্যন্ত জরুরি। বেশি উচ্চতায় আইডলিং স্পীড বাড়িয়ে দিলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়, যদিও বাইকের ক্ষতি হওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা থেকে যায়।

স্পেয়ার পার্টস বলতে সঙ্গে নেবেন এক জোড়া আনকোরা নতুন টিউব, স্পার্ক প্লাগ, অ্যাক্সিলারেটর কেবল্, ক্লাচ কেবল্, হেডলাইটের বাল্ব, এয়ার ফিল্টার। এতে মোটামুটি বড়সড় সব ঝামেলা সামলে নিতে পারবেন। একটা বোতল ইঞ্জিন অয়েলও সঙ্গে নিতে পারেন, কখন কাজে লেগে যায় বলা যায়না।

মাল ও তেলের ক্যানেস্তারা (ক্যানেস্তারা কেন প্রয়োজন সে প্রসঙ্গে পরে আসছি) বাইকে করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধুমাত্র দড়ি দিয়ে সেগুলোকে বাইকে বাঁধাটা খুব নিরাপদ নয়। পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। আমার পরিচিত একজনই এই মাল বওয়া নিয়ে বিশেষ ব্যতিব্যস্ত হয়েছিল। এজন্য বাইকের পেছনে একটা মাল বইবার একটা লোহার খাঁচা থাকলে সুবিধে হয়। খাঁচা সাধারণতঃ দুটো হয়, বাইকের পেছন দিকে দুধারে ফিট করে দেয়। মানালিতে বা দিল্লীতে যে বাইক ভাড়া পাওয়া যায়, তাতে সাধারণতঃ এই খাঁচা ফিট করাই থাকে। খাঁচাটা দেখতে কেমন হয়, তার একটা ছবি পাবেন এখানে।

নিজের বাইক হলে এরকম একটা লাগিয়ে নেওয়াই ভাল। আর এখানেই এনফিল্ড বুলেটের একটা মোক্ষম উপকারীতা দেখতে পাবেন। অন্য যে কোন বাইকের পেছনে এই খাঁচা ফিট করলে অত্যন্ত খাপছাড়া বিসদৃশ লাগে। কিন্তু বুলেটকে দেখলে মনে হয় সেটা ওই খাঁচা নিয়েই জন্মেছে, একেবারে খাপে খাপে মিশে গেছে বাইক আর খাঁচা। অবশ্য বাইক কেমন দেখতে সেটা কোনভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদি না আপনার উত্তমার্ধ বাইকের পেছনে সওয়ার হ’ন। 🙂 এই খাঁচা দিল্লী ও মানালিতে অনেক জায়গাতেই লাগানো যায় বলে শুনেছি।

মালপত্র বাঁধবার জন্য সাধারণ নাইলনের দড়ির চেয়ে বাঙ্গি কর্ড (bungee cord) বেশি উপযুক্ত। এগুলো কিছুটা ইলাস্টিক জাতীয় আর বেশ মোটা। এছাড়া দুধারে দুটো হুক লাগানো থাকে, সেগুলো ওই খাঁচার সঙ্গে আটকে দিতে বেশ সুবিধা। এই দড়ি যে কোন মাউন্টেনিয়ারিং বা ট্রেকিং সরঞ্জামের দোকানে পাবেন, বেশি খুঁজতে হবেনা।

মালপত্র নেওয়ার জন্য একটা বড় রুকস্যাকই উপযুক্ত। তবে সে রুকস্যাককে একটা মোটা প্ল্যাস্টিকের বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়াটাই ভাল। ঝড় ঝাপটা বস্তার ওপর দিয়েই যাবে, রাস্তার কাদা তাহলে ব্যাগে লাগবেনা। এছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন জলের বোতল, কিছু খাবার দাবার, ক্যামেরা ইত্যাদি নেওয়ার জন্য কাঁধে একটা ছোট রুকস্যাক নেওয়াও ভাল। সে রুকস্যাক যেন ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া ফিনফিনে ল্যাপটপ ব্যাগ না হয়। একটু শক্তপোক্ত হওয়া জরুরি।

এবার আসি তেলের ক্যানেস্তারায়। লাদাখের রাস্তায় পেট্রল পাম্প অতি দুর্লভ বস্তু। মানালি-লেহ হাইওয়েতে একটিই পাম্প আছে, টান্ডি বলে একটা জায়গায়। মানালি থেকে বড়জোর শ’খানেক কিলোমিটার হবে। তারপর প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার কোথাও পেট্রল পাবেননা। ওই রাস্তায় আপনার বাইক কেমন তৈলপান করবে সেটা আগে থেকে বলা মুশকিল। তাই সাবধানের মার নেই। সঙ্গে অন্তত দশ লিটার তেল নেওয়াটাই ভাল। পাঁচ লিটারের দুটো জারিকেন নেবেন। এ জারিকেনগুলো বাইকের খাঁচায় বেশ সুন্দর ভাবে ফিট হয়ে যায়। জারিকেনের সঙ্গে তেল ঢালার জন্য একটা ফানেল নিতেও ভুলবেননা যেন।

বাইক এবং তার আনুষঙ্গিক ব্যাপার স্যাপার প্রায় সবই আলোচনা করেছি মনে হচ্ছে। যদি আরও কিছু মনে পড়ে তো আবার ফিরে আসব এ প্রসঙ্গে। এবার আসা যাক জামাকাপড় ওষুধ পত্রর বিষয়ে।

গরম জামা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলছিনা। ওটা একান্তভাবেই নির্ভর করে শীত সহ্য করার ক্ষমতার ওপর, যেটা কারুর কম কারুর বেশি থাকে। তাই নিজের আন্দাজ মত নেবেন। গরম জামা ছাড়াও দু’একটি জিনিস সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলোর কথাই বলি।

প্রথমত, দস্তানা। বাইক চালাতে গেলে দস্তানা বিনা গতি নেই, কারণ খালি হাতে চালাতে গেলে দু মিনিটেই হাত জমে কুলপি হয়ে যাবে। আবার বেশি মোটা দস্তানা পরে ক্লাচ ব্রেক ইত্যাদি ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ করাটা ঝামেলা। এটা আসলে একটা উভয় সঙ্কট। মোটা দস্তানা পরলে চালাতে অসুবিধে, পাৎলা দস্তানা পরলে ঠান্ডায় জমে যাবেন। আমি প্রচুর রিসার্চ করে গুচ্ছ টাকা গচ্চা দিয়ে Cramster বলে একটা কম্পানি থেকে ‘লাদাখ-প্রুফ’ রাইডিং গ্লাভস কিনেছিলাম।
http://www.cramster.in/categories/Cramster-Protective-Wear-Riding-Gloves/cid-CU00053167.aspx
যাত্রার প্রথম দিনই, রোহতাং-এর রাস্তায়, আমি রাগের চোটে সে দস্তানা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। ওটা এত মোটা আর শক্ত ছিল যে ক্লাচ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাজেই আমার উপদেশ হচ্ছে যে ওসব ফালতু জিনিসে মোটেই পয়সা খরচ করবেননা। পাতি বাংলা উলের দস্তানা বেশ ভাল কাজ দেয়। উলের দস্তানা পরে হাতের ফ্লেক্সিবিলিটি কমেনা একেবারেই। অসুবিধাটা হচ্ছে যে উলের বুনুনির ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকতে পারে, আর উলের ওপর বাইকের তেলকালি লাগলে (লাগাটা একপ্রকার নিশ্চিত), সেটা পরিষ্কার করাটা প্রায় অসম্ভব। আমার সঙ্গী জয় মানালি থেকে একটা একটু মোটা চামড়ার দস্তানা কিনেছিল, সেটাও বেশ ভালই কাজ দিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, রেনকোট। রেনকোট শুধু যে বৃষ্টি বা বরফ আটকাবে তা নয়, উইন্ড চিল বা হাওয়ার ঠান্ডারও অব্যর্থ দাওয়াই রেনকোট। তাপমাত্রা খুব কম না হলেও উইন্ড চিল কিন্তু অতীব ভয়ানক জিনিস, শরীরের উষ্ণতা হুহী করে শুষে নেয়। ওটার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটা খুব জরুরি। রেনকোট বলতে শুধু আলখাল্লা জাতীয় রেনকোট নয়। যেগুলোর একটা জ্যাকেট আর একটা প্যান্ট থাকে সেগুলোর কথা বলছি।

তৃতীয়ত, বালাক্লাভা মাস্ক (স্কিইং মাস্ক), বা সেটা না হলে নিদেন পক্ষে একটা মাঙ্কি ক্যাপ। এই মাঙ্কি ক্যাপ নিয়ে বাঙালিরা বাকি ‘প্রগতিশীল’ ‘স্টাইলিশ’ ভারতীয়দের কাছে প্রচুর আওয়াজ খেয়ে থাকে। কিন্তু আমি বুক ঠুকে বলতে পারি যে লাদাখের ঠান্ডায় মাঙ্কি ক্যাপের মত ভাল জিনিস দ্বিতীয়টি হয়না। মাঙ্কি ক্যাপ পরে তার ওপর হেলমেট চাপান, দেখবেন ঠান্ডা ফান্ডা আর গায়েই লাগছেনা। কাজেই আপনার বন্ধুবান্ধব বা উত্তমার্ধ যাই বলুন, ওই জিনিসটি সঙ্গে নিতে ভুলবেননা। ছবি তোলার সময় না হয় খুলে নেবেন, তাহলে ইজ্জৎ বাঁচবে।

***

তৃতীয় কিস্তি শুরু করি। একটা খুবই দরকারি জিনিসের কথা আগের পোস্টে লিখতে ভুলে গেছিলাম। কী করে ভুলেছিলাম কে জানে, কারণ এই জিনিসটির অভাব আমাদের পদে পদে পীড়া দিয়েছিল। সেটা হল একটা বড় সড় ওয়াটারপ্রুফ বুট, যেটা প্রায় হাঁটু অবধি উঠে থাকবে। রাইডিং বুটস কিনতে পারেন, কিন্তু একগাদা দাম। আমার ধারণা পাতি বাংলা গামবুটেই বেশ ভাল কাজ চলবে। তবে দেখে নেবেন যে ওটা পরে ব্রেক আর গিয়ার ঠিকঠাক ওঠানামা করাতে পারছেন কিনা। ওটার প্রয়োজন এই জন্যই, যে লাদাখের রাস্তায় অনেক জায়গায় নদী বা ঝর্ণা বয়ে যায়। সেগুলো পেরোনর সময় আছাড় খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। আমরা আছাড় খেয়ে দস্তুরমত জলকেলি করেছি, যেটার কথা ভাবলে এখনো আমার হাতপা ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই বড় নদীগুলো পেরোনর সময় মাটিতে (মানে জলের মধ্যে) পা নামিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাতে অন্তত আছাড় খাবেননা। কিন্তু ওয়াটারপ্রুফ বুট না থাকলে জলে পা নামালে জুতো মোজা ভিজবে, আর তার ফলে যে অনুভুতিটা হবে সেটাকে মোটেই আরামদায়ক বলা যায়না। অতএব বুট। বুটের আরেকটা উপকারীতা আছে। ওটা আপনার উচ্চতাটাকে এক-দেড় ইঞ্চি বাড়িয়ে দেবে। আমার নিজের উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি। বুলেটের সীটে বসে মাটিতে পা ভালভাবেই পৌঁছয়, কিন্তু খুব এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় মাঝে মাঝে মাটিতে পা দিতে অসুবিধে হত। তার ফলে এক আধবার আছাড় খেয়েছি, বা খেতে খেতে বেঁচেছি। বুট থাকলে কিছুটা সুবিধে হত।

এছাড়া অনেককে দেখেছি হাঁটুর ক্যাপ আর কনুইয়ের ক্যাপ পরতে। আমার মনে হয় এগুলোও অপ্রয়োজনীয়। আপনি খুব সম্ভবত একটা থার্মালের ওপর মোটা জিনস পরবেন। সেটা ভেদ করে হাঁটুতে চোট লাগতে হলে যে গতিতে বাইক চালানো প্রয়োজন, সেটা নেহাৎ পাগল না হলে লাদাখের রাস্তায় কেউ চালাবেনা।

***

এবার বাইক চালানোর পদ্ধতি নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। লাদাখ যাওয়ার পথে মানালিতে আমাদের আলাপ হয়েছিল হিমাচল পর্যটন বিভাগের এক অফিসারের সঙ্গে। বেশ অমায়িক লোক, ভাব জমে গেছিল সহজেই। আমরা বাইকে যাব শুনে উনি আমাদের দুটো উপদেশ দিয়েছিলেন। হুবহু ওনারই ভাষাতে (উচ্চারণ সমেত) ও দুটো লিখে দিচ্ছিঃ
১। আপড়েঁ সাইড মেঁ রহড়াঁ।
২। গাড়ি ক্লাচ পে নহী, গিয়ার পে চালানা।
ভদ্রলোক নির্ঘাৎ ছদ্মবেশী মুনিঋষি। এরকম অদ্ভুত কার্যকরী উপদেশ আর কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়েনা।

একটু ভাব সম্প্রসারণ করি। প্রথম উপদেশটার মানে হচ্ছে যে সবসময় রাস্তার বাঁ দিকে চালাবেন, ভুলেও ডানদিকে যাবেননা। লাদাখের রাস্তায় ধারের খাদগুলো কোন কোন জায়গায় এতটাই অতলস্পর্শী যে সেদিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাবার সম্ভাবনা। খাদ যদি রাস্তার বাঁপাশে থাকে, আর সেদিকে যদি বারবার চোখ ফেলতে না চান, তাহলে একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকবে রাস্তার ডানধারে চলে আসার। কিন্তু বাঁকের মুখে উল্টো দিক থেকে গাড়ি আসলেই বিপদ — নির্ঘাৎ ঠোকাঠুকি। কাজেই সচেতনভাবে সেই ডানদিকে চলে আসার প্রবণতাটাকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, রাস্তা যতই ফাঁকা হোক না কেন।

দ্বিতীয় উপদেশটির মানে হচ্ছে যে ক্লাচ যথাসম্ভব কম ব্যবহার করুন। ভারতীয় ড্রাইভার — চারচাকা এবং দুচাকা দুটোরই — অভ্যাস হচ্ছে একটু খারাপ রাস্তায় হাফ-ক্লাচ মেরে সেকেন্ড গিয়ারে চালানো। প্রথম দিন রোহতাং উঠবার সময় আমরাও সেরকমই করছিলাম। কিন্তু তাতে চারটে অসুবিধাঃ
১। রাস্তা ক্রমাগত খারাপই পাবেন। সব জায়গায় ক্লাচ টিপে চালাতে গেলে ক্লাচের বারোটা বাজবে।
২। বুলেটের ক্লাচটা বেশ শক্ত হয়। সর্বক্ষণ ওটা টিপে থাকতে গেলে একটু পরেই আঙুলে ব্যথা শুরু হয়ে যাবে। আমারও হয়েছিল।
৩। ক্লাচ টিপে সেকেন্ড গিয়ারে থাকলে মোক্ষম সময় দেখবেন যথেষ্ট টর্ক (torque) পাবেননা। এবড়ো খেবড়ো পাথর পেরোনর সময় টর্ক না পেলে উল্টে যাবার সম্ভাবনা।
৪। উংরাই রাস্তায় ক্লাচ টিপে থাকলে ব্রেকের ওপর চাপটা বেশি পড়ে। তাছাড়া হঠাৎ ব্রেক ছেড়ে গেলে গাড়ি বেমক্কা গড়িয়ে যেতে পারে।
অতএব, রাস্তা যদি খারাপ থাকে আর গাড়ির গতি কম করতে হয়, তবে ক্লাচের কথা ভুলে গিয়ে সিধা ফার্স্ট গিয়ারে ফেলে দিন গাড়ি। গড়গড়িয়ে বেরিয়ে যাবে। শুধুমাত্র গিয়ার চেঞ্জ করা ছাড়া যে ক্লাচ দিয়ে অন্য কিছু করা যায়, সে কথাটা সফরের কয়েকটা দিন বেমালুম ভুলে যান। উপকার পাবেন।

গাড়ির গতি যথাসম্ভব কম রাখুন। লাদাখের রাস্তায় সর্বত্র দেখবেন যে উপদেশবাণীসম্বলিত সাইনবোর্ডের ছড়াছড়ি। তাতে নানা ভাষায় নানা ভাবে আস্তে চলার উপকারীতা নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করা হয়েছে। ওগুলোকে নিছক ফাঁকা উপদেশ বলে অবহেলা করবেননা যেন, ওগুলো অমোঘ নির্দেশ। আমরা অক্ষরে অক্ষরে সে নির্দেশ পালন করে চলেছিলাম, এবং সে নির্দেশ পালন না করলে কী হতে পারে তার ভূরি ভূরি নিদর্শন দেখেছি রাস্তায়। আমাদের মোটামুটি রুল অফ থাম্ব ছিল যে পাহাড়ি রাস্তায় স্পীড চল্লিশের ওপর তুলবনা। খারাপ হলে কুড়ি, বা বড়জোর তিরিশ। ভুলেও থার্ড গিয়ারের ওপর উঠবনা। তাছাড়া প্রতিটি বাঁকে গতি কমাবো, আর যে সামনে থাকবে সে প্যাঁ প্যাঁ করে হর্ণ বাজিয়ে আমাদের উপস্থিতি জানান দেবে। ফলস্বরূপ, আমরা লাদাখ থেকে ফিরেছিলাম সারা গায়ে একটি আঁচড়ও না লাগিয়ে।

***

প্রায় সপ্তাহটাক ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলাম। এই ফিরলাম।

জ্ঞানগর্ভ উপদেশের পালা মোটামুটি শেষ। শুধু ওষুধপত্রের কথা কিছুটা বলে ইতি টানছি। আলোচনা, প্রশ্নোত্তর অতি অবশ্যই চলতে থাকুক।

ওষুধ বলতে জ্বর, সর্দি, এলার্জি আর পেটখারাপের ওষুধ সঙ্গে নেবেন। আর নেবেন ডায়ামক্স। মানালি থেকে বেরোনর (বা শ্রীনগর থেকে বেরোনর) দুদিন আগে থেকে এবেলা আধখানা আর ওবেলা আধখানা করে খেতে থাকুন। লেহ পৌঁছন অবধি ছাড়বেননা।

একটা স্বীকারোক্তি করে রাখি — আমার নিজের মনে হয় এ এম এস হওয়ার ধাতটা নেই। প্রথমবার যখন বাইকে করে গেছিলাম, তখন ডায়ামক্স গোড়ায় খাইনি। রোহতাং পেরোবার পর প্রথম খেয়েছিলাম, তাও আরেকজন বলল বলে। তা সত্ত্বেও আমার বা জয়ের, কারুরই এ এম এস হয়নি। দ্বিতীয়বার যখন প্লেনে করে গেলাম, শ্রীমতী ভেতোবাঙালিকে নিয়ম করে ডায়ামক্স খাইয়েছিলাম, কিন্তু তাও তিনি প্রথমদিন লেহতে বেশ কেলিয়ে পড়েছিলেন। মারাত্মক কিছু হয়নি অবশ্য। আমি নিজে খাইনি। কিন্তু যেদিন পৌঁছলাম সেদিনই গেস্ট হাউস থেকে দেড় কিলোমিটার হেঁটে লেহ বাজারে গেছিলাম ছানার জন্য চাল ডাল সবজি ফল পাকুড় কিনতে। কিচ্ছুটি টের পাইনি। অথচ, এ এম এস -এ ভুগতে আমি বহু মানুষকে দেখেছি নিজের চোখেই।

তাই, এ এম এস হবে কিনা এটা নিতান্তভাবেই বোধহয় ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। আর আগে থেকে সেটা বোঝার বা জানার কোন উপায় আছে বলে তো মনে হয়না। অতএব সাবধানের মার নেই। দিনে একখানা, দুবেলা আধখানা করে, খেতে থাকবেন।

মদ্যপান খবরদার করবেননা। নেহাত প্রচন্ড শীতের প্রকোপ এড়াতে হলে এক আধ পেগ রাম চলতে পারে, কিন্তু তার বেশি নয়। লেহ পৌঁছে যত ইচ্ছে ঢুকুঢুকু করুন, কিন্তু রাস্তায় নৈব নৈচ চ। মদ খেলে কী হতে পারে তার একটি নমুনা আমি চোখের সামনেই দেখেছি, ব্লগে তার রসালো বিবরণও আছে। আরেকটি গল্প শোনা (ফার্স্ট হ্যান্ড)। দুই বন্ধু গাড়ি করে ব্যাঙ্গালোর থেকে গেছিল। তাদের মধ্যে একজন যাবার পথে কারগিল পেরিয়েই মদ খেয়ে চোখ উল্টে পটল তোলে তোলে অবস্থা। অন্য বন্ধুটির হাজার বারণ সত্ত্বেও। শেষে তাকে আর্মি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। অন্য ছেলেটি শেষমেষ একাই গাড়ি চালিয়ে লাদাখ ঘুরেছিল।

শারীরিক ক্ষমতা, বিশেষ করে কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমে বড় কোন গোলযোগ না থাকলে ধূম্রপানে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা তো তাই বলে। জয় আর আমি সারা রাস্তায় প্রায় যখনই দাঁড়িয়েছি, চিমনির মত ধোঁয়া ছেড়েছি। কিছু তো হয়নি।

শারীরিক ক্ষমতাটাও বেরোবার আগে একটু যাচাই করে নেওয়া ভাল। কয়েকটা ছোট টেস্ট লিখছি। সেগুলোতে পাশ করলে নো প্রবলেম। পাশ করতে না পারলে চেষ্টা করতে থাকুন। দিন পনেরো নিয়মিত চেষ্টা করলেই হয়ে যাবে। তার পরেও যদি না হয় তো বোধহয় বাইকে লাদাখের ঝুঁকিটা না নেওয়াই ভাল।

১। ১০ মিনিটের মধ্যে ১৮-২০টা ডন ও ২৫-৩০টা বৈঠক মারতে পারা উচিত। এতে রাস্তায় বাইক ঠেলতে হলে যে পেশিশক্তির প্রয়োজন, সেটার কিছুটা বন্দোবস্ত হবে।

২। কার্ডিওভাস্কুলার টেস্ট —
— ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিটে ১০ কিলোমিটার হাঁটুন (ওটা বেড়ে দু ঘন্টা হলেও খুব ক্ষতি নেই)
অথবা
— ১৫ মিনিটের মধ্যে ২ কিলোমিটার দৌড়ন
অথবা
— ১ ঘন্টায় মোটামুটি উঁচুনিচু রাস্তায় ১৮-২০ কিলোমিটার সাইকেল চালান (গিয়ার ছাড়া সাইকেল হলে ১৫ কিলোমিটার যথেষ্ট)
তিনটের মধ্যে একটা পারলেই যথেষ্ট, তিনটেই পারার কোন প্রয়োজন নেই। তবে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে। এগুলো করার পর একেবারে হেদিয়ে পড়লে চলবেনা। হাঁপ তো নিশ্চয়ই ধরবে, সেটা নিয়ে চিন্তা নেই। চোখে সর্ষেফুল না দেখলেই হল।

খেলাধুলোর অভ্যেস থাকলে এই লিস্টি পড়ে হাসি পাবে। কাজেই এই উপদেশ কেবলমাত্র তাঁদের উদ্দেশ্যেই, যাঁদের খেলাধুলোর চর্চা নেই।

Advertisements

One thought on “মোটরবাইকে লাদাখ ভ্রমণ প্রস্তুতি – কিছু জ্ঞানগর্ভ উপদেশ

  1. টেকনিক্যাল ব্যাপারস্যাপারগুলো ছাড়া লেখাটা দারুণ মুচ্‌মুচে লাগলো। 🙂
    লাদাখ বিষয়ে তুমি বেশ ব্যুৎপত্তি অর্জন করে ফেলেছো। 🙂

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s